দুই দশকেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মূল ঘোষিত প্রাণঘাতী হাম রোগটি আবারও ভয়াবহ আকারে ফিরে এসেছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সাম্প্রতিক হামের সংকটে প্রথমবারের মতো দুইজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফিলাডেলফিয়ার একটি গ্রামীণ এলাকা ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টির দুই বাসিন্দা এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কিত অতিরিক্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া না হলেও কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, তাদের কেউই হামের টিকা নেননি।
যুক্তরাষ্ট্রে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বিরল হলেও বর্তমানে সংক্রমণ এক জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালে দেশটিতে ২ হাজার ২৮৯ জন হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যা ১৯৯১ সালের পর এক বছরে সর্বোচ্চ সংক্রমণের রেকর্ড ছিল। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৯ হাজার ৬৪৩ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তবে গত বছরের সেই রেকর্ড চলতি ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মধ্যেই অতিক্রম করে যায়। সিডিসির হিসাব মতে, চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে মোট ২ হাজার ৭৭৭ জন হাম আক্রান্ত রোগী নথিভুক্ত হয়েছেন, যা বিগত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, মোট আক্রান্তদের ৯৪ শতাংশ মানুষই টিকা গ্রহণ করেননি।
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাস-জাতীয় শ্বাসযন্ত্রের বিষাক্ত রোগ। একটি সফল এবং ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির সুবাদে ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে হামমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। সিডিসির ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকে গণ-টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে হামের কারণে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষের মৃত্যু হতো।
সিডিসির উপদেষ্টা ড. অ্যাডাম র্যাটনার গত বছর খ্যাতনামা চিকিৎসা সাময়িকী 'জেএএমএ'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতির পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, ২০২০ সালের পর থেকে কোভিড-১৯ এর টিকা এক অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার হয়। কোভিড টিকার প্রতি জন্ম নেওয়া সেই সংশয় ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরবর্তীতে অন্যান্য সাধারণ টিকার ওপর এসে প্রভাব ফেলেছে। তিনি মনে করেন, একবার মানুষের মধ্যে যখন টিকাবিরোধী মনোভাব এবং তীব্র বিভাজন তৈরি হয়েছে, তখন শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাধ্যবাধকতা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের টিকা-সংশয়বাদী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র হাম-হাম্পস-রুবেলা বা এমএমআর টিকার সুরক্ষার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে একই সাথে তিনি মন্তব্য করেছেন যে, টিকা নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটি বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব শতভাগ প্রতিরোধ করতে হলে কোনো দেশের অন্তত ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের হার বজায় রাখতে হয়। উদ্ভূত এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আগামী নভেম্বর মাসে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউএইচও) আওতাধীন প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (পাহো) এক বিশেষ বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এই ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো এখনও নিজেদের 'হামমুক্ত' দেশ হিসেবে দাবি করতে পারবে কি না, সেই বৈঠকে সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সূত্র: আরটি