Jahirul Hasan
প্রকাশ : Aug 26, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

আশঙ্কাজনকভাবে কমছে জন্মহার, বিশ্বজুড়ে রেকর্ড জনসংখ্যা হ্রাসের শঙ্কা

বিশ্বব্যাপী সন্তান জন্মদান বা উর্বরতার হার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক উর্বরতার হার প্রতিস্থাপন যোগ্যতার নিচে অবস্থান করছে। এর ফলে আগামী প্রজন্মের মধ্যে বিশ্বের সার্বিক জনসংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জেসাস ফার্নান্দেজ-ভিলাভার্দে এবং নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্যাট্রিক নরিকের যৌথভাবে রচিত ‘টেরা ইনকগনিটা: দ্য ইকোনমিক্স অব আ শ্রিংকিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী নিম্ন উর্বরতার হার বিশ্বের শ্রমশক্তিকে সংকুচিত করবে। পাশাপাশি দ্রুত বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যাও বাড়াবে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি এবং কল্যাণমূলক ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হবে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা স্থির রাখার জন্য গড়ে প্রতি নারীর ২.২টি সন্তান থাকা প্রয়োজন। তবে বর্তমানে বৈশ্বিক এই হার সর্বোচ্চ ২.১৯-এ নেমে এসেছে। গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী মানবজাতি ইতোমধ্যেই প্রতিস্থাপন যোগ্যতার নিচে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ শিশু জন্ম নেওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে তার চেয়ে কম জন্ম হচ্ছে। এটি এমন একটি পরিস্থিতি, যা মানবজাতির ইতিহাসে যুদ্ধ কিংবা মহামারীর সময়েও কখনও ঘটেনি।

১৯৫০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২৩৬টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২১৯টি দেশেই জন্মহার হ্রাস পেয়েছে। গড়ে প্রতি বছর দেশগুলোতে নারী প্রতি ০.০৬২টি করে জন্মহার কমছে এবং এই ধারা বন্ধ হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বিগত দশকগুলোতে বৃহৎ প্রজননক্ষম গোষ্ঠী থাকায় এখনই বৈশ্বিক জনসংখ্যা কমছে না। তবে এই ধারা আর মাত্র তিন দশক স্থায়ী হতে পারে। ২০৫৬ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ৯শ' কোটিতে (৯ বিলিয়ন) পৌঁছানোর পর তা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেতে শুরু করবে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রবণতা কেবল ধনী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে উর্বরতার হার কমে দাঁড়িয়েছে ০.৮৭, কলম্বিয়ায় ১.০১, ইরানে ১.৩৫ এবং ব্রাজিলে ১.৫২। গবেষকদের মতে, এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ গৃহায়ণ ও শিশু পরিচর্যা খরচ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, গর্ভনিরোধক ব্যবহার এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনসহ নানা কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।

নিম্ন উর্বরতার এই ধারা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। ছোট প্রজন্মের কারণে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাবে, যা ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে, পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা বজায় রাখতে এবং সরকারি অর্থায়নে টানাটানি তৈরি করবে। গবেষকদের হিসাব মতে, যুক্তরাষ্ট্রে যদি বার্ষিক ২ শতাংশ হারে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং কর্মশক্তি ০.৫ শতাংশ হারে সংকুচিত হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ১.৫ শতাংশে নেমে আসবে।

এদিকে জাতিসংঘও তাদের জনসংখ্যার দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস সংশোধন করেছে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের প্রাক্কলনে বলা হয়েছিল, ২১০০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ১,১২০ কোটি (১১.২ বিলিয়ন) এবং শতাব্দী শেষের আগে এটি কমার কোনো লক্ষণ থাকবে না। তবে ২০২৪ সালে সংশোধিত প্রাক্কলনে সংস্থাটি জানায়, ২০৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১,০৩০ কোটিতে (১০.৩ বিলিয়ন) পৌঁছাবে এবং ২১০০ সাল নাগাদ তা সামান্য কমে ১,০২০ কোটি (১০.২ বিলিয়ন) হতে পারে। বিশ্ব জনসংখ্যা ২০২২ সালে ৮ শতকোটির কোটা অতিক্রম করে এবং বর্তমানে এটি প্রায় ৮৩০ কোটিতে রয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক দীর্ঘদিন ধরেই জন্মহার হ্রাসের বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। নতুন এই গবেষণার ফল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) শেয়ার করে একজন ব্যবহারকারী যখন বিষয়টিকে ‘অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করেন, তখন মাস্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখেন, “আমি বহু বছর ধরে এই বিষয়ে সতর্ক করে আসছি।”

১৩ সন্তানের জনক মাস্ক প্রজনন হার কমে যাওয়াকে সভ্যতার জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২২ সালে তিনি লিখেছিলেন, “নিম্ন জন্মহারের কারণে জনসংখ্যা ধসে যাওয়া গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের চেয়েও সভ্যতার জন্য অনেক বড় ঝুঁকি।” এর পর তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, “কম জন্মহার সভ্যতা ধ্বংস করে দেবে।” বিষয়টি জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে জন্মহার পুনরুদ্ধার না হলে ইউরোপ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

এমনকি সম্প্রতি প্রাচীন রোমের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা সম্পর্কিত একটি গবেষণার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মাস্ক উল্লেখ করেন, “রোম পতনের মূল কারণ ছিল তারা রোমানদের জন্ম দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।”

সূত্র: আরটি

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্রাজিলের ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ প্রত্যাখ্যানে চীনের সমর্থন

1

কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করছেন না মোজতবা খামেনি!

2

নতুন হজ প্যাকেজ ঘোষণা, কমল বিমান ভাড়া

3

নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে ইইউর অভিনন্দন

4

সড়কপথে যুক্ত হচ্ছে দ্বীপ জেলা ভোলা

5

ডাকসুর সাহিত্য পত্রিকা ‘আভাস’ এর প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন

6

অর্ধশতাধিক দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ট্রাম্প

7

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটিতে এমপি ফজলুর রহ

8

হঠাৎ সৌদি সফরে এরদোয়ান, আলোচনায় যেসব ইস্যু

9

জেডি ভ্যান্সের সফরের তথ্য ‘ফাঁস’ করার দায়ে সিক্রেট সার্ভিস এ

10

জ্বালানি খাত: মার্কিন ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে যুুক্তরা

11

তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তদন্ত চেয়ে উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফের যৌথ

12

ট্রাম্পের ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়কে আরও

13

গুলশান থেকে লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার

14

শরীয়তপুরে শেখ ইয়াসিনের উদ্যোগে বেঁদেপল্লীর যুবকদের ক্রীড়া সা

15

ইংলিশ চ্যানেলে নৌকায় আগুন, দেড় শতাধিক অভিবাসী উদ্ধার

16

চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস ও বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই : জোনায়

17

দেশে আসেন দেখা হবে রাজপথে

18

দিল্লিতে হাসিনার গণমাধ্যমে ভাষণ নিয়ে যা বলছে ভারত

19

ন্যাশনাল লাইফের ট্রিপল এ রেটিং: দাবি পরিশোধে শতভাগ নিশ্চয়তার

20