Jahirul Hasan
প্রকাশ : Nov 6, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবির পর আরেক ধাক্কা, ‘ট্রাম্প তোরণ’ নির্মাণে আদালতের নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের দৃশ্যপট নিজের মনের মতো করে সাজাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২৫০ ফুট উঁচু বিশাল মেগা তোরণ নির্মাণের পরিকল্পনায় বড় ধরনের আইনি ধাক্কা লেগেছে। টানা আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে দীর্ঘ জনশুনানি এবং নাগরিকদের তীব্র বিরোধিতার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। তবে সেই অনুমোদনের এক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন জেলা জাজ তানিয়া চুটকান ১৫ দিনের জন্য এই স্থাপনার সব ধরনের নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। 

ওবামা প্রশাসন কর্তৃক নিযুক্ত এই বিচারক নির্দেশ দিয়েছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন বা আসামিপক্ষ প্রস্তাবিত এলাকার আশেপাশে কোনো ধরনের নির্মাণ-সম্পর্কিত কার্যক্রম শুরু করতে বা কার্যকর করতে পারবে না। পরবর্তীতে প্রদত্ত এক স্মারকে বিচারক চুটকান অর্থনৈতিক প্রভাব ও যানজট সৃষ্টির চরম ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে এই আদেশের ব্যাখ্যা দেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশন’ (এনসিপিসি)—যা ওয়াশিংটনের স্থাপত্য ও নকশা পরিবর্তনের তদারককারী দুটি প্রধান ফেডারেল সংস্থার একটি—ভার্চুয়াল বৈঠকে ৮-৪ ভোটে বিতর্কিত এই তোরণ নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করে। এই বৈঠকের আগে ১২০ জনেরও বেশি নাগরিক, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিলেন সাবেক সেনাসদস্য (ভেটেরান), প্যানেলের কাছে প্রকল্পটিকে স্থগিত করার আকুল আবেদন জানান। আগামী জানুয়ারিতে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগেই কাজ এগিয়ে নিতে মরিয়া ট্রাম্পের অনুরাগী ও মনোনীত সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিশন তড়িঘড়ি করে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেয়। প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আগামী দুই বছরের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম তোরণ হিসেবে পরিকল্পিত এই বিশাল স্থাপত্যের কাজ শেষ করা।

তবে এই সময়সীমা শুরু থেকেই তীব্র আইনি চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের মুখে পড়েছে। যুদ্ধাহত সাবেক সেনাসদস্য এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণবাদীরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি হাইপ্রোফাইল মামলা দায়ের করেছেন। তাদের মতে, তোরণটির বিশাল আকৃতি ও অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক স্থাপনার দৃশ্যপট বিনষ্ট করবে। বিশেষ করে লিঙ্কন মেমোরিয়াল, আর্লিংটন হাউস এবং রবার্ট ই লি মেমোরিয়ালের মধ্যবর্তী সংযোগকারী দৃষ্টিসীমা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে এটি আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের শেষকৃত্যের গম্ভীর পরিবেশ ক্ষুণ্ন করবে। 

বিরোধীদের প্রধান আইনি যুক্তি হলো, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বেআইনি, কারণ এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ওয়াশিংটনে যেকোনো নতুন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য ‘কমেমোরেটিভ ওয়ার্কস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

বৃহস্পতিবার দিনভর প্রস্তাবিত স্থানটির আশেপাশে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্র যে অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, সেই ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি ডন বায়ার বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেন, একজন ব্যক্তির অহংবোধ থেকে তৈরি এই বিশাল বিকৃতি সেখানে শায়িত প্রতিটি বীর সেনাসদস্যের প্রতি চরম অবমাননা। তবে বৈঠকের আগেই কমিশনের চেয়ারম্যান এটিকে ট্রাম্পের একটি ‌‘ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করে এর পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে লিঙ্কন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুল থেকে শুরু করে কেনেডি সেন্টার সংস্কারের মতো একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে, যা সমালোচকদের চোখে প্রেসিডেন্টের নিজস্ব ‘অহংকার মেটানোর প্রকল্প’। গত অক্টোবরে যখন ট্রাম্প ওভাল অফিসে প্রথম এই তোরণের বিভিন্ন স্কেল মডেল প্রদর্শন করেন, তখন এক সাংবাদিক তোরণটি কার উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে জানতে চাইলে ট্রাম্প নিজের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলেছিলেন, ‘আমার জন্য।’ তবে পরবর্তীতে তিনি দাবি করেন যে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী, আমেরিকানদের চেতনা, সামরিক শক্তি ও দক্ষতার স্মারক হিসেবে নির্মিত হচ্ছে। 

সম্প্রতি তিনি নতুন যুক্তি দিয়ে দাবি করেছিলেন যে, পটোম্যাক নদীর নিকটবর্তী ব্যস্ত ট্রাফিক সার্কেলে অবস্থিত এই তোরণটি একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র এবং ড্রোন ও গোলাবারুদ সংরক্ষণের সামরিক কমপ্লেক্স হিসেবে কাজ করবে। অবশ্য বৃহস্পতিবার এনসিপিসির কাছে পেশ করা চূড়ান্ত নথিতে কোনো সামরিক উপাদানের কথা উল্লেখ ছিল না, যদিও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের দাবি, পরবর্তীতে কোনো মূলগত পরিবর্তন ছাড়াই এগুলো যুক্ত করা সম্ভব।

দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য দিনে দুটি ১০ ঘণ্টার শিফটে ২৪ ঘণ্টা কাজ করার পরিকল্পনা করেছিল প্রশাসন। কিন্তু বৃহস্পতিবার জাতীয় পার্ক সেবা (এনপিএস) আদালতে স্বীকার করে যে, তাদের নিয়োগ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই সাইটের চারপাশে দাগ কেটে প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছিল, যা আর করা হবে না বলে তারা আদালতকে নিশ্চিত করে। 

শুনানিতে মামলার মূল বাদী মাইকেল লেমন বলেন, সমগ্র পর্যালোচনা প্রক্রিয়াটি তড়িঘড়ি করে একটি পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে কংগ্রেসকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং আর্লিংটনের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের পেশাদার মূল্যায়নকে উপেক্ষা করা হয়েছে। 

আগামী দিনে এনপিএস তদারকির দায়িত্বে থাকা হাউস ন্যাচারাল রিসোর্সেস কমিটির হবু চেয়ারম্যান ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জ্যারেড হাফম্যান বলেছেন, এটি আমেরিকার আদর্শ ও আইনের অবমাননা এবং ২৫০তম বার্ষিকীতে জনগণের রায়কে সম্মান না জানিয়ে নিজেকে রাজা ভাবা প্রেসিডেন্টের আবদার মেটানো অনুচিত।

গত আগস্ট মাসে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস (এনপিএস) কর্তৃক প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় প্রশাসন নিজেই স্বীকার করেছিল যে, এই তোরণটি প্রায় ৪২টি ঐতিহাসিক স্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়বে আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেট্রি ও লিঙ্কন মেমোরিয়ালের মতো ৬টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ওপর। এটি ক্যাপিটল হিল, জর্জটাউন ওয়াটারফ্রন্ট এবং পেন্টাগন থেকে দেখা যাবে, যা ঐতিহাসিক ওয়াশিংটন দৃশ্যপটের ধারাবাহিকতা নষ্ট করবে। এনপিএস বিকল্প স্থানের কথা বিবেচনা করলেও শেষ পর্যন্ত পটোম্যাক নদীর তীরকেই একমাত্র উপযুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে। 

আমেরিকার ‘জাতীয় ঐতিহাসিক সংরক্ষণ আইন’-এর ১০৬ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের প্রকল্পের জন্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্বাধীন ঐতিহাসিক সংরক্ষণ গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো আবশ্যক। তবে গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ১০৬ ধারার অধীনে পরামর্শ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করে চুক্তি ছাড়াই সরাসরি বাস্তবায়নের পথ বেছে নেয় এবং এনসিপিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আধ ঘণ্টার মধ্যেই স্বরাষ্ট্র বিভাগ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করে। কিন্তু আদালতের এই তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ ট্রাম্পের তোরণ নির্মাণের দ্রুতগতিকে আপাতত থামিয়ে দিল। 

এর মাধ্যমে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ হারানোর পর এবার আদালতেও মুদ্রার উল্টোপিঠ দেখলেন ট্রাম্প। 

সূত্র: সিএনএন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এক বছরেই শেষ পগবার মোনাকো অধ্যায়, আবারও তিনি ফ্রি এজেন্ট!

1

রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধির

2

সৌদি আরবে এশিয়ান কাপ স্থগিত

3

তাপপ্রবাহ কমলো ২০ জেলা থেকে, অব্যাহত রয়েছে পাঁচ জেলায়

4

মেসি ছাড়াই দেশে ফিরছেন আর্জেন্টাইনরা

5

‘চাঁদে গেলেও নোয়াখালী পাওয়া যায়’, বিভাগ দাবিতে ডেপুটি স্পিকা

6

বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন

7

ইরানে হামলার নির্দেশ দিতে পারেন ট্রাম্প, হরমুজ প্রণালিতে জ্ব

8

জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ১৮তম সংশোধনী হবে ঐতিহাসিক

9

কোচের পদ হারিয়ে আশরাফুল বললেন, ‘অবিচার করা হয়নি’

10

ভিন্নমত দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহারের শঙ্কা পাকিস্তানে,

11

ইমরান খানের চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবিতে ক্রিকেট কিংবদন্তিদের চি

12

মামলা ছাড়া হবে না ফরেনসিক, কমিটির এই দাবিতে অডিওর সত্যতা যা

13

সৌদি নৌবাহিনী প্রধানের সঙ্গে মার্কিন নৌ কমান্ডারের বৈঠক

14

রাফিনিয়ার চোটের নেপথ্যে আনচেলত্তির ‘ষড়যন্ত্র’ দেখছেন স্প্যান

15

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

16

আবারও ইতালির কোচ হলেন মানচিনি

17

বাংলাদেশকে রিভিউ নিতে বলে সাবেকদের তোপের মুখে স্মিথ

18

ঢাকায় বিএনপির শোভাযাত্রা কাল, নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী

19

কেন হঠাৎ দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ছেন লাখ লাখ প্রবাসী

20