পাকিস্তানে ভিন্নমত দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহারের শঙ্কা বাড়ছে। দেশটির মানবাধিকারকর্মী মাহরাং বালুচকে গত ২২ জুন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় কেন্দ্রীয় সরকার ও বালুচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ আরও গভীর করেছে। সন্ত্রাসবাদ ও হত্যা মামলায় তাকে সাজা দেওয়ার পর রাজপথে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যা প্রমাণ করছে, বালুচ সমাজে তার প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা কতটা সুদৃঢ়। একই সঙ্গে, অহিংস রাজনৈতিক ও মানবাধিকার নেতাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে পাকিস্তানে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা জেমসটাউনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট প্রকাশিত আন্দ্রেয়া সেরিনোর এক বিশ্লেষণে এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণে মাহরাংয়ের সাজাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে আইনি ও সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামোর ব্যবহার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
কে এই মাহরাং বালুচ?
বিশ্লেষণে মাহরাং বালুচকে মানবাধিকার আন্দোলন থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসা এক নারী হিসেবে তথ্য উপস্থাপন করেছেন আন্দ্রেয়া সেরিনো। তিনি বলেছেন, মাহরাং বালুচ বালোচিস্তানের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘বালুচিস্তান ইয়াকজেহতি কমিটি’ (বিওয়াইসি)-এর নেতৃত্ব দেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের ৩০ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে সংগঠনটিকে অহিংস মানবাধিকার আন্দোলনের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিওয়াইসি বিশেষ করে বালুচ জনগোষ্ঠীর সদস্যদের গুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখছে। এসব গুমের ঘটনায় পাকিস্তানের আধাসামরিক বাহিনী ফ্রন্টিয়ার কর্পসের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাহরাংয়ের মানবাধিকার আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পেছনে পারিবারিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। তার বাবা গাফফার বালুচ লাঙ্গোভ বালোচ ন্যাশনাল পার্টির নেতা ছিলেন। ২০১১ সালে তিনি গুম হন। পরে মাহরাং মানুষকে সংগঠিত করতে শুরু করেন। ঐতিহ্যবাহী কালো বালুচি চাদর পরার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও তুলে ধরেন।
২০২০ সালে মাহরাংয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়। ওই বছর কোয়েটার বোলান ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন তিনি। বর্ধিত ফি, বৃত্তি কমানো, প্রশাসনিক অবহেলা ও জেলা কোটা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রতিবাদে আন্দোলনটি গড়ে উঠেছিল।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, এসব পরিবর্তনের ফলে বালোচিস্তানের অনুন্নত অঞ্চলের আবেদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে জেলা কোটা বাতিলের কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগ পাওয়ার পথ সংকুচিত হচ্ছিল। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাহরাং একজন গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পান।
গোয়াদার মামলা ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাহরাংয়ের রাজনৈতিক তৎপরতা চূড়ান্ত রূপ নেয়। সেই সময়ে তিনি ‘বালুচ লং মার্চ’-এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই প্রতিবাদ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল, জোর করে গুম এবং অঞ্চলটিকে প্রভাবিত করা অন্যান্য নীতি বন্ধ করা। পরের বছর তিনি বিওয়াইসি-র প্রধান সংগঠক হন। ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই ‘বলপূর্বক গুমের’ প্রতিবাদে গোয়াদার বিওয়াইসি-র এক বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সংঘর্ষ ঘটে। এ ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়।
কোয়েটার সন্ত্রাসবিরোধী আদালত ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গোয়াদারে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকে হত্যার দায়ে মাহরাং, সিবঘাতুল্লাহ বালুচ ও অন্যান্য বিওয়াইসি নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করে। তবে আদালত গোয়াদার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাহরাং ও সিবঘাতুল্লাহর সরাসরি কোনো যোগসূত্রের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
মাহরাং ও বিওয়াইসি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও পাকিস্তান দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারার আওতায় ছিল। তবে সংগঠনটি ‘ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম অথরিটি’ (নাকটা)-র নিষিদ্ধ তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
আন্দ্রেয়া সেরিনোর মতে, মাহরাংয়ের এই সাজা বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা ‘টিপিং পয়েন্টে’র প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তিনি বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে তার সাজা বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা ইসলামাবাদের মূলধারার বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ ও দুর্বল করতে আদালত এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনি কাঠামো ব্যবহারের ইঙ্গিত দিতে পারে। এক্ষেত্রে ২০০৭ সালে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত খালেদ বালুচের ঘটনার সঙ্গে তুলনাও টানা হয়েছে।
শেষ পর্বে মাহরাংয়ের মামলার প্রসঙ্গ টেনে ইমরান খানের দলের সঙ্গে হওয়া একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন সেরিনো। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একই চিত্র দেখা গিয়েছিল রাওয়ালপিন্ডির সন্ত্রাসবিরোধী আদালতের একটি রায়ে। সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ’ (পিটিআই)-এর ৪৭ জন সদস্যের বিরুদ্ধেও একইভাবে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এনে রায় দেওয়া হয়েছিল।
ইমরান খান ও মাহরাং বালোচ দুজনই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। যা এ রায়ের পেছনের রাজনৈতিক কারণ সম্পর্কে জল্পনা-কল্পনাকে উস্কে দিয়েছে।
সেরিনো বলছেন, ইমরান খান ও মাহরাংয়ের ঘটনাগুলো ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির রাজনৈতিকীকরণের মাধ্যমে হুমকি চিহ্নিতকরণ ও তা নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন পদ্ধতির উদাহরণ হতে পারে। যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ চিহ্নিতকরণের জটিল সম্পর্ককে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
সূত্র: জেমসটাউন