পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত আট মার্কিন মেরিন সেনা আহত হয়েছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি এতদিন ধরে পেন্টাগনের নজর এড়িয়ে গেলেও সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তা জনসমক্ষে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, একটি জলযানে অবস্থানকালে ইরানি নৌ-বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এই সেনারা আহত হন। আহতদের মধ্যে সাতজন সাধারণ সেনা এবং একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ ও পরবর্তীতে সৃষ্ট ধোঁয়ার কারণে তারা ধোঁয়াজনিত শ্বাসকষ্ট এবং সম্ভাব্য ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরিতে ভুগছেন, তবে কারও আঘাতই আশঙ্কাজনক নয় বলে জানা গেছে। অবাক করার বিষয় হলো, ঘটনার পর প্রায় দশ দিন পেরিয়ে গেলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। পরবর্তীতে চুপিসারে নিজেদের অফিশিয়াল 'ডিফেন্স ক্যাজুয়াল্টি অ্যানালাইসিস সিস্টেম' ডাটাবেজে এই আট মেরিন সেনার নাম যুক্ত করা হয়।
ইরানের সাথে চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শুরু থেকেই ওয়াশিংটন হতাহতের সঠিক সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেবল আহতদের বিষয়ই নয় বরং প্রাণহানির তথ্য গোপন করার অভিযোগও সামনে এসেছে। কিছুদিন আগেই আরেক প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ জন সেনা নিহতের কথা স্বীকার করলেও সংঘাত শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু তাই নয়, গত সপ্তাহে কোনো স্পষ্ট কারণ দর্শানো ছাড়াই হঠাৎ করে পেন্টাগনের আহতদের তালিকায় নতুন করে ৩৭ জনের নাম যোগ করা হয়। এর ফলে বর্তমানে ইরান যুদ্ধে আহত মার্কিন সেনার স্বীকৃত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬১ জনে। কিন্তু বিতর্ক এড়াতে পেন্টাগন এদের অর্ধেকেরও বেশি সেনাকে সরাসরি ইরান যুদ্ধের শিকার হিসেবে না দেখিয়ে কৌশলগতভাবে দূরবর্তী অভিযানের ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত করেছে।
এই বিপুল তথ্য গোপনের নেপথ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে নাকি কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তথ্যের এই হেরফের ঘটছে, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও পেন্টাগন প্রধান বা যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ গণমাধ্যমের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোকে সম্পূর্ণ 'বানোয়াট ও জঘন্য অপপ্রচার' বলে এক বাক্যে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু শুধু মানবসম্পদের ক্ষয়ক্ষতিই নয়, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিশাল আর্থিক ব্যয় নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের স্বচ্ছতা এখন প্রশ্নের মুখে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকমের দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ইরান সামরিক অভিযানের খরচ আনুমানিক ৪৩.৬ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হলেও এতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির হিসাব যুক্ত করা হয়নি। অথচ গত জুলাই মাসেই প্রকাশিত পেন্টাগনের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা গেছে, ধ্বংসপ্রাপ্ত যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপন, ঘাঁটি সংস্কার এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করার সার্বিক খরচ হিসাব করলে এই যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় ইতোমধ্যে ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অব্যাহত চাপের মুখে ইরানও পিছু হটতে নারাজ। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ওয়াশিংটন যদি এই সামরিক উস্কানি এবং আগ্রাসন বন্ধ না করে তবে তাদের জন্য সামনে আরও তিক্ত ও 'অবিস্মরণীয় শিক্ষা' অপেক্ষা করছে, যার পরিণতিতে মার্কিনদের আরও ভারী আর্থিক ও মানবসম্পদের মূল্য চুকাতে হবে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তেহরান কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অহেতুক যুদ্ধ কিংবা মার্কিন সেনা হত্যা করতে চায় না, তবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহিরাগত মার্কিন চাপ প্রতিরোধে ইরান তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে।
সূত্র: আরটি