গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ২০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মিসর। একই সঙ্গে চলতি বছরে দেশটির শোধনাগারগুলোর ব্যবহার সক্ষমতা ৮০ শতাংশের ওপরে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি।
মিসরের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতে অবস্থিত মেলেইহা গ্যাস স্থাপনা আগামী মাসে উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। দৈনিক ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতার এই স্থাপনা চালু হলে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকারের প্রচেষ্টায় সহায়ক হবে।
সম্প্রতি মিসরের পেট্রোলিয়াম ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী করিম বাদাওয়ির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব পরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরা হয়। বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছাড়াও মিসরীয় জেনারেল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (ইজিপিসি), মিসরীয় ন্যাচারাল গ্যাস হোল্ডিং কোম্পানি (ইজিএএস) এবং সাউথ ভ্যালি ইজিপশিয়ান পেট্রোলিয়াম হোল্ডিং কোম্পানির (এসভিপি) শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
৫ বছরে ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ
উৎপাদন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে সাউথ ভ্যালি পেট্রোলিয়াম।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিসরের জ্বালানি খাতের অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশীয়ভাবে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী করিম বাদাওয়ি বলেন, শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়ানো এবং পরিচালন দক্ষতা উন্নত করার ফলে ইতোমধ্যে মিসরের জ্বালানি আমদানির বিল কমেছে। একই সঙ্গে ডিজেল আমদানিও কমেছে।
অন্যদিকে, উচ্চমূল্য সংযোজিত বিশেষায়িত পেট্রোলিয়াম পণ্যের রফতানি বেড়েছে। এতে দেশটির রফতানি আয় বাড়াতে সহায়তা করছে বলে জানান তিনি।
নতুন গ্যাসের মজুত খোঁজার পরিকল্পনা
দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাস খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ইজিএএস অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং নতুন গ্যাসের মজুত যুক্ত করার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশল উপস্থাপন করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস অনুসন্ধানে পাওয়া ইতিবাচক ফলাফল নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ডেনিস গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কারকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিসর মনে করছে, এখনও তুলনামূলকভাবে কম অনুসন্ধান চালানো হয়েছে- এমন অঞ্চলগুলোতে আরও অনুসন্ধান পরিচালনা করা হলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অনাবিষ্কৃত বা কম অনুসন্ধান করা এলাকাগুলোকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দ্রুত কূপ খননে নতুন চুক্তি কাঠামো
অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে নতুন ধরনের চুক্তি কাঠামো প্রণয়ন করছে ইজিপিসি। এর লক্ষ্য হলো গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানের জন্য কূপ খননে প্রয়োজনীয় সময় কমানো এবং নতুন অনুসন্ধান কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
মন্ত্রী বাদাওয়ি বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের বকেয়া অর্থ নিয়মিত পরিশোধ এবং গত দুই বছরে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হয়েছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো মিসরের তেল ও গ্যাস খাতে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পশ্চিম মরুভূমিতে অনুসন্ধান বাড়াবে সাউথ ভ্যালি
সম্প্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড করা সাউথ ভ্যালি পেট্রোলিয়াম এখন উৎপাদন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে আল-বারাকা উন্নয়ন এলাকার বিভিন্ন প্রকল্পকে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিম মরুভূমি এলাকায় নতুন অনুসন্ধান সমীক্ষা ও সিসমিক জরিপ পরিচালনা করা হবে।
এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন তেল ও গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত শনাক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
জ্বালানি খাতে ডিজিটাল রূপান্তর
মিসরের তেল ও গ্যাস খাতের পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য উদ্বৃত্ত প্রকল্প সামগ্রী ও অব্যবহৃত সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনার জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল চালু করা হয়েছে। প্রকল্পে ব্যবহারের পর পড়ে থাকা বা অতিরিক্ত সরঞ্জাম অন্য প্রকল্পে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
এছাড়া পরিবেশগত কার্যক্রম ও পরিবেশগত কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও চালু করা হয়েছে।
উৎপাদন বাড়ানোই প্রধান অগ্রাধিকার
পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী করিম বাদাওয়ি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি প্রতিটি কর্মসূচির জন্য স্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাদাওয়ির মতে, দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোই মিসরের জ্বালানি খাতের প্রধান অগ্রাধিকার।
গ্যাস অনুসন্ধান ২০ শতাংশ বাড়ানো, শোধনাগারের ব্যবহার সক্ষমতা ৮০ শতাংশের ওপরে নেওয়া, নতুন গ্যাসের মজুত আবিষ্কার এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার মাধ্যমে মিসর তার জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
বিশেষ করে মেলেইহা গ্যাস স্থাপনার দৈনিক ১০ কোটি ঘনফুট উৎপাদন শুরু এবং পশ্চিম মরুভূমি ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অনুসন্ধান জোরদার হলে দেশটির অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহে চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পেট্রোলিয়াম পণ্য রফতানি বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। সূত্র: ইজিপ্ট টুডে, ইজিপ্ট অয়েল-গ্যাস গ্রুপ