যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার আয়োজিত যৌথ সামরিক মহড়ার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ১০টিরও বেশি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে উত্তর কোরিয়া। বৃহস্পতিবার এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে উত্তর কোরিয়ার যেকোনো পদক্ষেপ মোকাবিলায় নিজ দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌথ সামরিক অনুশীলনে আমেরিকার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও গত বুধবার ওই যৌথ মহড়ার কড়া সমালোচনা করেছিলেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং। এরপরই পিয়ংইয়ং উপকূল থেকে জাপান সাগরের দিকে ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঘটনা ঘটল।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পিয়ংইয়ং অঞ্চল থেকে কোরীয় উপদ্বীপের পূর্ব সাগরের দিকে উত্তর কোরিয়ার কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক ডাকা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের এই পরীক্ষা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের ভয়াবহ লঙ্ঘন।’’ একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়াকে অবিলম্বে এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন গিউ-বেক আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, এই স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ৬০০ মিলিমিটারের মাল্টিপল রকেট লাঞ্চার বলে মনে করা হচ্ছে। সিউল এই ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির সীমান্ত এলাকায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
উত্তর কোরিয়া এর আগে ৬০০ মিলিমিটারের এই ব্যবস্থাকে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বলে জানিয়েছিল। এর আগে, একই দিনে আন গিউ-বেক বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে প্রায় ৮০ থেকে ১২০টি পারমাণবিক বোমা বা অস্ত্র রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সাথে পুনরায় কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ইচ্ছা প্রকাশের পর আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার চলমান সামরিক মহড়া সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার শেষ করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন বলে গত সোমবার দাবি করেন ট্রাম্প। তবে কিমের বোন কিম ইয়ো জং বুধবার বলেছেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সাম্প্রতিক কোনো যোগাযোগের বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি। একই সঙ্গে জং বলেন, উত্তর কোরিয়ার প্রতি আমেরিকার শত্রুতাপূর্ণ নীতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।
সিউলের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ইয়াং মু-জিন বলেন, কিম ইয়ো জং একদিন আগে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তা কেবল কথার কথা ছিল না, ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া সম্ভবত সেটাই প্রমাণ করতে চেয়েছে।
তিনি বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের নেপথ্যে একাধিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে; যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকা-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার তীব্র বিরোধিতা প্রকাশ, উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ভাণ্ডার নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় অসন্তোষ জ্ঞাপন এবং পিয়ংইয়ংয়ের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে বহিরাগত শক্তির জল্পনা-কল্পনার বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেওয়া।
অধ্যাপক ইয়াং মু-জিন বলেন, ‘‘উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তার বিষয়টি যে উত্তর কোরিয়াই নির্ধারণ করবে; এটি ছিল সেই বার্তা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে হয়তো তারা তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কার্যকারিতাও যাচাই করে নিয়েছে।
চলতি সপ্তাহে সিউল সফরকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দক্ষিণ কোরিয়াকে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্বের মধ্যে কোনো পক্ষ না নেওয়ার আহ্বান জানান। কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমাতে উত্তর কোরিয়ার প্রতি আমেরিকার শত্রুতাপূর্ণ নীতি পরিহার করার পরামর্শ দেন তিনি।
সূত্র: রয়টার্স।