Jahirul Hasan
প্রকাশ : Aug 18, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

হরমুজ ঘিরে বড় সিদ্ধান্তহীনতায় যুক্তরাষ্ট্র

সংকটকবলিত হরমুজ প্রণালি নিয়ে নজিরবিহীন ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থা ‘কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস’ (সিআরএস)। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির সার্বিক নৌ-চলাচল ব্যবস্থার প্রশাসনিক দায়িত্ব সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। 

তবে এর বিকল্প হিসেবে অঞ্চলটিকে দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দিয়ে ওয়াশিংটন নিজেদের সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নিতে পারে বলেও আভাস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই দুটি চরমপন্থী বিকল্প ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির যে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান কঠোর ও আগ্রাসী মনোভাব। ইরানকে কেবল প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ট্রাম্প বরং গত কয়েক মাসে তিনি এই অঞ্চলের ওপর একক কর্তৃত্বের দাবি জানিয়ে আসছেন। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নাম দিয়ে সাধারণ বেসামরিক জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রহরায় চলাচলের ব্যবস্থা করা কিংবা পরবর্তীতে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ দিয়ে গোপন সামরিক ও বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজ পারাপার করছে বলে দাবি করার মাধ্যমে তিনি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন। 

কেবল তা-ই নয়, এই প্রণালিকে সুরক্ষিত রাখার অজুহাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ২০ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব এনেছেন তিনি। এমনকি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে ঘোষণা করার মতো প্রথাভাঙ্গা হুমকিও দিয়ে রেখেছেন তিনি, যা আন্তর্জাতিক আইন ও এই অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা প্রতিবেদনটিতে হরমুজ প্রণালির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাস্তব শর্তের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যদি ওয়াশিংটনের সাথে কোনো সমঝোতায় পৌঁছায় অথবা সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই লড়াই চালিয়ে যেতে পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়ে, কেবল তখনই কেবল একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। এই রূপরেখার অধীনে ওয়াশিংটন তার নিরাপত্তার ব্যয় মেটাতে ট্রানজিট ফি গ্রহণ করতে পারে। তবে এই ধরনের একক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও তার বৈশ্বিক মিত্রদের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি থেকে বিশাল বিচ্যুতি ঘটাবে। তুরস্ক, ভারত, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং খোদ উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই স্বাধীন ও বাধাহীন নৌ-চলাচলের পক্ষপাতি। তারা এমন কোনো একক নিয়ন্ত্রণ চায় না যা ভবিষ্যতে নতুন সামরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাছাড়া মার্কিন বাহিনীর স্থায়ী অবস্থান বজায় রাখার জন্য যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও সামরিক সক্ষমতার প্রয়োজন, তা বজায় রাখা ওয়াশিংটনের জন্যও একটি মরণপণ চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

মার্কিন একক কর্তৃত্বের বাইরে একটি আন্তর্জাতিক বা যৌথ সহযোগিতামূলক ব্যবস্থার সম্ভাবনাকেও নাকচ করছে না প্রতিবেদনটি। মালাক্কা প্রণালির সফল মডেলের উদাহরণ টেনে এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলো যৌথভাবে একটি বহুপক্ষীয় তহবিল বা ব্যবস্থাপনা পরিষদ গঠন করতে পারে, যা এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ সচল রাখবে। এই পদ্ধতিতে কোনো দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন না করেই আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা সম্ভব হতে পারে।

তবে মুদ্রার অন্য পিঠে রয়েছে চরম অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হুট করে এই অঞ্চল থেকে তাদের সামরিক মনোযোগ সরিয়ে নেয় কিংবা নিজেদের অবস্থান সংকুচিত করে, তবে হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। এর ফলে ইরান ও মার্কিন বাহিনীর পাল্টা-পাল্টি হামলায় বাণিজ্যিক জলপথটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 

কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি মাত্র ২২ নটিক্যাল মাইল চওড়া হলেও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি অতিসংবেদনশীল পয়েন্ট। বিশ্বের প্রতি চার ব্যারেল সমুদ্রবাহিত তেলের অন্তত এক ব্যারেল পারাপার হয় এই সরু পথ দিয়ে। ফলে এই অঞ্চলের সামান্যতম অস্থিরতাও বৈশ্বিক বাজারে তেলের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে, যা মূলত এশীয় এবং ইউরোপীয় আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সম্পর্কের ওপর নয় বরং গোটা বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণে প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠতে চলেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পশ্চিম তীরে সংঘর্ষে ১ ইসরায়েলি নিহত, আহত ৩

1

রাবি স্টেশন সংস্কার ও সকল ট্রেনের যাত্রাবিরতিসহ ৫ দাবি শিক্ষ

2

যুক্তরাষ্ট্র কি তবে মিয়ানমারে ফিরছে আবারও?

3

আইকনিক গার্ল যে বার্তা দিলেন

4

অটোরিকশার দাপটে অচল সড়ক,গুদের ওপর বিষফোরা হয়ে দাঁড়িয়েছে

5

রাশিয়া থেকে আরও এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে ভারত

6

ছাত্র আন্দোলনের মুখে অমিত শাহ নতি স্বীকার করলেন

7

আইপিএল মাতানো রিংকু সিংকে বিয়ে করতে যাওয়া কে এই এমপি

8

৫৪ রানে অলআউটের পরও নিজেদের ওপর বিশ্বাস ছিল : মিরাজ

9

যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া করবে দক্ষিণ কোর

10

ভেদরগঞ্জ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ফাঁকা রেখে চিকিৎসকদের মিটিং,

11

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় বেরোবির তিন শিক্ষকসহ ১১ জন স্থায়ী বহিষ

12

একাদশে ভর্তিতে আসন সংকট হবে না, ফাঁকা থাকবে কয়েক লাখ

13

সাহস ও সেবায় অনন্য নজির স্থাপনে ৯২ জনকে দেওয়া হলো পুলিশ পদক

14

ছবির মতো বাস্তবেও যদি ভুলে যান? জবাবে যা বললেন টম-জেন্ডায়া

15

যুদ্ধের অষ্টম মাসে পদত্যাগ করলেন ইরানের তেলমন্ত্রী

16

ক্যাটরিনাকে নিয়ে কটাক্ষকারীদের কড়া জবাব দিলেন সালমান খান

17

বাবার জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মোজতবা খামেনি, দাবি শাশুড়ির

18

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্রকে বহিষ্কার করবে না মোদি সরকার

19

‘গুলশানের চামেলি’ হবেন কলকাতার ‘পাখি’

20