Jahirul Hasan
প্রকাশ : Aug 12, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ইরানের ভয়ে গোপনে বিমান পাল্টানোর কথা স্বীকার করলেন ট্রাম্প

তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় সম্ভাব্য ইরানি হামলার হুমকির কারণে গোপনে বিমান বদল করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 
মঙ্গলবার ট্রাম্প নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

তার ভাষ্য, মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক কর্মকর্তাদের পরামর্শেই শেষ মুহূর্তে তাকে অন্য একটি বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ট্রাম্প বলেন, “সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক বাহিনী আমাকে অন্য ফ্লাইট, অন্য একটি বিমানে যেতে বলেছিল। আমাকে তাদের কথা মেনে চলতে হয়।”

তবে ওই সময় বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি ট্রাম্প যে বিমানে উঠেছেন বলে সবাইকে দেখানো হয়েছিল, সেটিতে থাকা সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তাও জানতেন না যে, প্রেসিডেন্টকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সম্ভাব্য ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের কাছে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্পকে বহনকারী বিমানে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে- এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি শনাক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এছাড়া নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে এমন তথ্য ছিল যে, ন্যাটো সম্মেলনস্থলের কাছে এক ব্যক্তিকে কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ দেখা গেছে।

তবে ওই হুমকির প্রকৃতি বা সেটি কতটা নির্দিষ্ট ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

মঙ্গলবার ওহাইওতে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, “মনে হয়, সেখানে একটি হুমকি ছিল। আমি বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি কিছু জিজ্ঞেস করিনি। আমি অনেক হুমকি পাই।”

তিনি আরও বলেন, “এমন অনেক হুমকি আছে, যেগুলোর কথা আপনারা জানেন না।”

ট্রাম্প এর আগে ন্যাটো সম্মেলনের সময় বলেছিলেন, ইরানের কাছে তিনি ছিলেন ‘নম্বর ওয়ান টার্গেট’।

ক্যামেরার সামনে উঠেছিলেন এয়ার ফোর্স ওয়ানে
গত ৮ জুলাই তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় এই নজিরবিহীন নিরাপত্তা কৌশল নেওয়া হয়।

তুরস্কে পৌঁছানোর সময় ট্রাম্প কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে গিয়েছিলেন। তবে ফেরার সময় তিনি পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহারের সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘পুরোনো দিনের কথা মনে করে’ ওই বিমানে ফিরবেন।

৮ জুলাই টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেই তাকে আঙ্কারা বিমানবন্দরে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিমানে ওঠার পর একটি ক্যাটারিং ট্রাক ব্যবহার করে তাকে গোপনে বের করে নেওয়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাকটি বিমানের অন্য পাশে উঁচু করে তোলা হয়েছিল। ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে ওই ট্রাকে উঠে যান। এরপর তাকে গোপনে অপেক্ষমাণ একটি ছোট সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিমানটি ছিল সি-৩২এ বোয়িং ৭৫৭-এর পরিবর্তিত সংস্করণ, যা সাধারণত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।

সাংবাদিকদের অন্ধকারে রাখা হয়েছিল
ট্রাম্পের এই গোপন বিমান পরিবর্তনের পুরো ঘটনাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে বাইরে থেকে মনে হয় প্রেসিডেন্ট আগের বিমানেই রয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও আলাদাভাবে সিঁড়ি ব্যবহার করে সি-৩২এ বিমানে ওঠেন। উদ্দেশ্য ছিল পুরো প্রক্রিয়াটিকে স্বাভাবিক দেখানো।

অন্যদিকে সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা আগের এয়ার ফোর্স ওয়ানেই উঠে পড়েন। তাদের বিমানের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়। কিন্তু তারা জানতেন না যে, প্রেসিডেন্ট ওই বিমানে আর নেই।

হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বিমানে থাকা একটি মিডিয়া পুলের প্রযোজক জানান, জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশটি তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল।

একজন আলোকচিত্রী একপর্যায়ে জানালার পর্দা সামান্য তুললে তাকে দ্রুত সেটি নামিয়ে দিতে বলা হয়।

এছাড়া সাংবাদিকরা বিমানের সামনে ও পেছনে দুটি ক্যাটারিং ট্রাক দেখতে পেয়েছিলেন। বিমানবন্দরে প্রেস ভ্যানটিও মোটরকেডের এত পেছনে ছিল যে ট্রাম্পের বিমানে ওঠার ছবি তোলার সুযোগ ছিল না।

‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ নিয়েও ছিল বিশেষ কৌশল
প্রযুক্তিগতভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেকোনও বিমানে থাকলে সেটিই ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ নামে পরিচিত। তবে এ ঘটনায় এই পরিচিত কলসাইন ব্যবহার করেও কৌশল করা হয়।

ট্রাম্প যে সি-৩২এ বিমানে গোপনে চলে যান, সেটি ‘রিচ ১৮’ কলসাইন ব্যবহার করে উড্ডয়ন করে। অন্যদিকে সাংবাদিকদের বহনকারী পুরোনো বিমানটি ‘এএফ১’ কলসাইন ব্যবহার করতে থাকে। এর ফলে বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না যে, প্রেসিডেন্ট আর ওই বিমানে নেই।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য অবশ্য মূল বিমানে ছিলেন। দুই বেনামি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ওই বিমানে ছিলেন।

পরে আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন ট্রাম্প
গোপনে সি-৩২এ বিমানে তুরস্ক ছাড়ার পর ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে তিনি আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মাইল্ডেনহল ঘাঁটিতে বিমানটি অবতরণের পর তাকে ওই বিমান থেকে নামতে দেখা যায়। তবে সি-৩২এ থেকে কীভাবে তিনি আবার পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ফিরে গেলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এরপর কাতারের উপহার দেওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়ে তিনি ওয়াশিংটনে ফেরেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও তৎকালীন আলোচনায় ট্রাম্প ইরানের হুমকির কথা উল্লেখ করেছিলেন; তবে আগের গোপন বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি প্রকাশ করেননি।

সাংবাদিকেরা যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুরস্ক থেকে আসার সময় তাদের বিমানের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে কেন বলা হয়েছিল, তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, “আপনারা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে আছেন, কারণ আমাদের যেসব বদমাশের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তাদের কারণে।”

তিনি আরও বলেছিলেন, তার জীবনের ওপর ‘সব সময়ই হুমকি’ রয়েছে এবং ইরানের তালিকায় তিনি ‘নম্বর ওয়ান’।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্পকে সম্ভাব্য হামলা থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার এই গোপন কৌশল এখন সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) আমেরিকাবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক হোসে জামোরা বলেন, প্রেসিডেন্টকে অনুসরণ করে সংবাদ সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে না ফেলার দায়িত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের রয়েছে।

তিনি বলেন, “বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানানো উচিত, যাতে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।”

তবে ট্রাম্প প্রশাসন কী মাত্রার হুমকি শনাক্ত করেছিল এবং সেটি কতটা তাৎক্ষণিক ছিল, তা এখনও পুরোপুরি প্রকাশ করেনি।

গত মাসে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সম্ভাব্য বিমান হামলার আশঙ্কা এবং শেষ মুহূর্তে বিমান বদলের ঘটনা নতুন করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে। 

সূত্র: বিবিসি

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দিল্লিতে হাসিনার গণমাধ্যমে ভাষণ নিয়ে যা বলছে ভারত

1

সরকারকে ক্ষমা প্রার্থনা ও শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে

2

ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে অস্কার দৌড়ে ‘মেরা লিয়ারি’

3

যমজ ভাইয়ের সঙ্গে যমজ বোনের বিয়ে, পুরোহিতও যমজ

4

আইকনিক গার্ল যে বার্তা দিলেন

5

ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের এক মাস: ধ্বংসস্তূপে চলছে মরদে

6

ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক তিন শতকের ‘যন্তর মন্তর’

7

আজ এইচএসসিতে অনুপস্থিত ২৯ হাজার পরীক্ষার্থী, বহিষ্কার ৩০

8

ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে সহিংসতা, যা বললেন রাহুল গান্ধী

9

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে গড়ে ওঠা শরীয়তপুরের কারা নির্যাতিত বি

10

ইতালির কোচ হচ্ছেন গার্দিওলা!

11

লেবাননের বনভূমিও পুড়িয়ে ছাই করছে ইসরায়েল

12

আড়াই মাসে ভোটার বাড়ল তিন লাখ ৯ হাজার

13

ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌ

14

গাজা চুক্তি মানতে নেতানিয়াহুর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগ

15

যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও গাজায় দৈনিক এক শিশুর প্রাণহানি

16

জেডি ভ্যান্সের সফরের তথ্য ‘ফাঁস’ করার দায়ে সিক্রেট সার্ভিস এ

17

এনআইডি সংশোধন : বছরে আবেদন প্রায় ১০ লাখ, পেন্ডিং দেড় লাখ

18

অবশেষে সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে মুখ খুললেন শাবনূর

19

টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভকে ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত কর

20