চীনের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযান দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একের পর এক অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ায় দেশটির সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব ও প্রস্তুতিতে সাময়িক দুর্বলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কয়েকজন কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তবে একই সময়ে এই অভিযান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সেপ্টেম্বরে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি দুই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা- জেনারেল ঝাং ইউশিয়া ও জেনারেল লিউ ঝেনলিকে দল ও সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কার করে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দলীয় শৃঙ্খলা লঙ্ঘন এবং নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বস্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুইজনের বিরুদ্ধেই তদন্ত শেষে মামলাগুলো সামরিক প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠানো হয়েছে। ঝাং ইউশিয়া ছিলেন চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সামরিক কমান্ড কাঠামোয় শি জিনপিংয়ের পর সবচেয়ে ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের একজন। অন্যদিকে লিউ ঝেনলি ছিলেন কমিশনের জয়েন্ট স্টাফ বিভাগের প্রধান। ফলে তাঁদের অপসারণকে পিএলএর সর্বোচ্চ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শীর্ষ কমান্ডে বড় শূন্যতা
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শীর্ষ পর্যায়ের ধারাবাহিক অপসারণের ফলে চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সাত সদস্যের কাঠামোয় বেশ কয়েকটি পদ এখনও খালি রয়েছে। দ্বিতীয় সারির বেশ কিছু কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উঠে এলেও তাঁদের অনেকেরই শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম।
সামরিক নেতৃত্বে দ্রুত পরিবর্তনের ফলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমন্বয় এবং কমান্ড কাঠামো কতটা কার্যকর থাকবে- তা নিয়ে আঞ্চলিক সামরিক পর্যবেক্ষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ার সময়ে এই পরিবর্তনগুলো বেশি নজর কাড়ছে। দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত এলাকাতেও চীনের সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নাকি নিয়ন্ত্রণ জোরদার?
চীনা কর্তৃপক্ষ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগকে সামনে এনেছে। এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝাং ও লিউয়ের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যদের পদোন্নতিতে সহায়তা এবং এর বিনিময়ে বিপুল অর্থ ও উপহার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও স্বজনদের কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে তদারকি না করার অভিযোগও রয়েছে।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক বাহিনীতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছেন। তার নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীতে বড় ধরনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তদন্ত, অপসারণ ও বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন। তবে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনীর এত উচ্চপর্যায়ে ধারাবাহিক পরিবর্তনের রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। বিশেষ করে ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাশাপাশি ‘অবিশ্বস্ততা’ এবং ‘গোষ্ঠী ও উপদল তৈরি’র অভিযোগকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
শীর্ষ পর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে স্বল্পমেয়াদে পিএলএর যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্তুতিতে প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। বিশেষ করে জটিল ও বড় আকারের সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক সমন্বয় এবং কমান্ড কাঠামোর স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চীনের সামরিক সক্ষমতা হঠাৎ কমে গেছে বা দেশটি বড় ধরনের যুদ্ধ পরিচালনা করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। বরং প্রশ্নটি মূলত নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরিবর্তনের ফলে স্বল্পমেয়াদে অপারেশনাল প্রস্তুতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে। এর বিপরীতে, দীর্ঘমেয়াদে শি জিনপিংয়ের দৃষ্টিতে এই শুদ্ধি অভিযান বাহিনীতে আরও কঠোর রাজনৈতিক আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে। নতুন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন হলে ভবিষ্যতে বাহিনীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হতে পারে।
তাইওয়ান ঘিরে বাড়তি নজর
চীনের সামরিক বাহিনীর এই পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন তাইওয়ানকে ঘিরে বেইজিংয়ের সামরিক চাপ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন; অন্যদিকে তাইওয়ান নিজস্ব গণতান্ত্রিক সরকার ও সামরিক বাহিনী নিয়ে স্বশাসিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে চীনের সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে এর প্রভাব তাইওয়ানসংক্রান্ত সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা, মহড়া ও কমান্ড প্রস্তুতির ওপর পড়ে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করছেন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তবে বর্তমান পরিবর্তন থেকে চীনের ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, চীনের সামরিক বাহিনীতে চলমান শুদ্ধি অভিযানকে শুধু দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামো পুনর্গঠন এবং শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করার একটি বড় প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব চীনের সামরিক সক্ষমতার ওপর কী হয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
তথ্য সূত্র- রয়টার্স।