বিশ্বজুড়ে যখন একের পর এক যুদ্ধের ধাক্কা, তখন সামরিক শক্তিতে নিজেদের অবস্থান তৈরিতে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ভারত। দীর্ঘদিনের অস্ত্র আমদানিকারক দেশের তকমা ঝেড়ে ফেলে দেশটি এখন সামরিক উৎপাদনে নিজেদের স্বনির্ভর করার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অস্ত্র রপ্তানিতেও রেকর্ড গড়ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা উৎপাদন ২ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার রেকর্ড ছুঁয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। অথচ মাত্র পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যাটি ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং ২০১৩-১৪ সালে ছিল মাত্র ৬১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ২০২৯ সালের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদন ৪ লাখ ২৩ হাজার কোটি এবং রপ্তানি ৭০ হাজার ৫০০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে দিল্লি।
ভারতের এ অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো সামরিক খাতে রেকর্ড বাজেট বৃদ্ধি এবং নীতিগত পরিবর্তন। ২০১৩-১৪ সালে যেখানে ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকায়। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নতুন অস্ত্র ও প্রযুক্তি কেনার মূলধন বা ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচারে। দৈনন্দিন খরচের বাইরে সামরিক আধুনিকায়নের আসল এ বাজেটটি ২০১৪-১৫ সালের ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
তবে পুরো গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো প্রতিরক্ষা রপ্তানি। ২০১৩-১৪ সালে যে দেশটির সামরিক রপ্তানি ছিল মাত্র ৯৭০ কোটি টাকা, গত অর্থবছরে তা ৫৬ গুণের বেশি বেড়ে রেকর্ড ৫৪ হাজার ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় তৈরি সামরিক সরঞ্জাম বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে পৌঁছাচ্ছে।
আর এই অর্জনের বড় এক কারিগর বেসরকারি খাত। একসময় ভারতের প্রতিরক্ষা খাত পুরোটাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু গত অর্থবছরের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৫ শতাংশই এসেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে, যা সরকারি পিএসইউ-গুলোর অবদানের প্রায় কাছাকাছি। এমনকি মোট উৎপাদনেও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বেড়ে ২৪ শতাংশে (প্রায় ৫৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা) পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধগুলো প্রমাণ করেছে, প্রয়োজনের সময়ে বিদেশি নির্ভরতা কত বড় ঝুঁকি হতে পারে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে অস্ত্রের জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় দূর করতে দেশীয় উৎপাদনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে ভারত। এরই মধ্যে ৯৭টি তেজস এমকে-১এ যুদ্ধবিমান এবং ১৫৬টি প্রচণ্ড যুদ্ধ হেলিকপ্টার কেনার জন্য ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা পুরোপুরি দেশীয় কারখানায় তৈরি হবে।
একই সঙ্গে সেনাবাহিনী প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর হতে আইডেক্স ও অদিতি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় সাতশো স্টার্টআপ ও ছোট উদ্ভাবকদের সামরিক খাতে যুক্ত করেছে। ডিআরডিও তাদের ২ হাজার ৭০০-র বেশি প্যাটেন্ট ও প্রযুক্তি বেসরকারি খাতের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করেছে। পাশাপাশি ৫ হাজার ৫২১টি সামরিক সরঞ্জাম চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো আর বিদেশ থেকে কেনা হবে না, দেশেই তৈরি করতে হবে।
এ কৌশলী পদক্ষেপের ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের ব্যবহৃত ১৭৫ ধরনের গোলাবারুদের মধ্যে ১৫৯টিই এখন দেশে তৈরি করছে; অর্থাৎ গোলাবারুদে ৯১ শতাংশ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে দেশটি।
অবশ্য রাতারাতি সব যন্ত্রাংশ নিজেদের দেশে তৈরি করা সবসময় অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। তবুও, সংকটকালে বিদেশি অস্ত্রের যন্ত্রাংশ কিংবা গোলাবারুদের অপেক্ষায় বসে থাকার দিন যে শেষ হতে চলেছে; ভারতের এ ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্প সে কথাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে।