ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান (কমার্শিয়াল সাবসিডিয়ারি) গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন, যার মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলো পরিচালিত হতো। সেই প্রতিষ্ঠানে বাইরের বিনিয়োগকারীদের মালিকানার অংশ কেনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল। তবে সেই পরিকল্পনা সামনে আসতেই ফুসে উঠে ইউরোপের ৫৫ দেশসহ ফুটবলবিশ্ব। পরে পিছু হটে সেটি বাতিল করতে বাধ্য হন ইনফান্তিনো।
২০১৯ সাল থেকে ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন ইংলিশ কিংবদন্তি আর্সেন ওয়েঙ্গার। যার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ফুটবলের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, ফিফার অনলাইন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং যুব প্রতিযোগিতাগুলো। ইনফান্তিনোর বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রথম প্রকাশ হওয়ার এক সপ্তাহ পর ওয়েঙ্গার ফিফার মাধ্যমে এক বিবৃতি দিয়ে ‘স্বচ্ছতা ও সততা’ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত নন দাবি করে ওয়েঙ্গার বলছেন, ‘ফিফার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে আমার পক্ষ থেকে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমি এই কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মাধ্যমেই প্রথম এ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে পারি। এই প্রকল্প প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ছিল একেবারেই প্রয়োজনীয় এবং এতে কোনো প্রশ্নের অবকাশ নেই। কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ফিফা স্বাধীনভাবে ফুটবলের স্বার্থে প্রতিশ্রুতি, স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে কাজ করে।’
ফুটবল বিশ্বকাপের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় টুর্নামেন্টকে ‘বেসরকারিকরণ’ করার পরিকল্পনার পক্ষে সমর্থন আদায়ে ইনফান্তিনো ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ৪ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে কয়েক দিনের তীব্র সমালোচনার উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশ সব ধরনের ফিফা প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকিও দিয়েছিল। সেই তালিকায় আরও ৪১ দেশ যুক্ত হয়, ক্রমান্বয়ে সমর্থন হারাতে থাকায় ইনফান্তিনো শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।
ফিফা সভাপতির এমন বাণিজ্যিক প্রস্তাবনা নিয়ে সমালোচনা করেছেন সংস্থাটির খোদ সাধারণ সম্পাদক মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রমও। তিনি বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে সৃষ্ট পরিস্থিতি বোঝা এবং মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনার সমাপ্তি সৌভাগ্যবশত প্রকল্পটি স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত হওয়ার মাধ্যমে হয়েছে। আমাদের যতই হতাশ করুক না কেন, এটি যেন বাস্তবতাকে আড়াল না করে। আমরা সবাই এমন এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি, যা বোঝা এবং মেনে নেওয়া কঠিন।’
ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত গ্রাফস্ট্রম। ২০১৬ সালে ইনফান্তিনো ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার চিফ অব স্টাফ হন। পরে ২০২৪ সালে তিনি ফিফার মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন, যা সংস্থাটির অন্যতম ক্ষমতাধর পদ। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ স্মারকে লিখেছেন, ‘আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, সব সময় যা আমাদের একত্রিত করেছে, সেই লক্ষ্যেই মনোযোগী থাকুন। ফুটবলের সেবা করা এবং ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের পাশে থাকা। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে একযোগে এবং ফিফার গঠনতন্ত্র ও বিধিমালা পুরোপুরি মেনে কাজ চালিয়ে যান।’
‘আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, প্রশাসনের সদস্য হিসেবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে আপনাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। এ নিয়ে আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তি, অস্থির সময় এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাগুলো আসে ও চলে যায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান, এর লক্ষ্য এবং বিশ্ব ফুটবলের প্রতি এর দায়িত্ব অটুট থাকে। তাই আমাদের সব সময় পেশাদারিত্ব, বিচক্ষণতা এবং সংযম বজায় রাখতে হবে।’