মাঠে হার-জিত যাই ঘটুক, আবেগটা লুকিয়ে রাখতে পারদর্শী ছিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনি। কিন্তু বিশ্বের মাত্র দ্বিতীয় কোচ হিসেবে দু’বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ হারিয়ে তার সংবাদ সম্মেলন থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা নতুন। এর আগেই স্কালোনি ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষে আর্জেন্টিনার কোচিং ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
গতকাল ২০২৬ আসরের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরেছে আর্জেন্টিনা। স্প্যানিশদের একপেশে দাপটের পর সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনার এক সাংবাদিক স্কালোনিকে তার ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন করেন। এটাই তাকে আবেগী করে তোলে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার কিছুটা সময় প্রয়োজন সিদ্ধান্তের জন্য। তবে সুন্দর একটি গ্রুপ ছিল। সবার সঙ্গে সবার বোঝাপড়াও অসাধারণ। এই গ্রুপটি নতুন করে পাওয়া আর হয়তো হবে না।’
একপর্যায়ে কান্না থামাতে না পেরে সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন স্কালোনি। ডিসেম্বরে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)-এর সঙ্গে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। ৪৯ বছর বয়সী এই কোচ জানান, ‘আমি কী করতে চাই, সে সম্পর্কে আমার একটা ধারণা আছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ করব, তারপর দেখব। সত্যি বলতে, আমার কিছু সময় নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। কারণ আমি জানি না, এর চেয়ে বড় কিছু আর করতে পারব কি না।’
২০২২ বিশ্বকাপজয়ী কোচের এই মন্তব্য শুধু অর্জিত সাফল্য এবং তার অধীনে আর্জেন্টিনার চারটি শিরোপা জয় নিয়েই নয়, বরং তিনি যে দলটি গড়ে তুলেছেন সেটিকেও ঘিরে। নিকোলাস ওতামেন্দি, রদ্রিগো ডি পল, লিওনেল মেসি, লিয়েন্দ্রো পারেদেস, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, নিকোলাস তালিয়াফিকো ও গঞ্জালো মন্টিয়েলদের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে তিনি একটি বিশেষ দল গড়েছিলেন। যাদের মাঝে ছিল দারুণ বোঝাপড়া। তরুণ হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, লাউতারো মার্টিনেজরা সমন্বয়টাও করছিলেন খুব ভালোভাবে।
এটা ঠিক যে, কাতার বিশ্বকাপের পরের পরিস্থিতির সঙ্গে এবার পার্থক্য রয়েছে। আগামী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে আরও চার বছর পর। সে সময় বয়সের কারণে বর্তমান দলের অনেক অভিজ্ঞ ফুটবলারকে দলে রাখা কঠিন হবে। এখনও ঘোষণা না দেওয়া মেসি সম্ভবত খেলে ফেলেছেন নিজের শেষ বিশ্বকাপ। সবমিলিয়ে এবারের দলে থাকা ১৭ জন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফুটবলারের বড় একটি অংশকেও তখন বদলাতে হতে পারে। অর্থাৎ সামনে অপেক্ষা করছে বড় ধরনের প্রজন্ম পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ।
এ প্রসঙ্গে স্কালোনি বলেন, ‘এগিয়ে যেতে হলে অনেক কিছু লাগে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিজেকে আবার নতুন করে গড়ে তোলা, এমন একটি দল আবার তৈরি করা। এমন একটি দল বারবার তৈরি হয় না। আর সেটাই আমার হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।’ আলবিসেলেস্তেকে টানা দুটি বিশ্বকাপ ফাইনালে তোলা এই কোচের জন্য বিদায়ের ইঙ্গিত অবশ্য নতুন নয়। এর আগে তার এমন ঘোষণা ছিল আরও আচমকা ও ভক্তদের জন্য ধাক্কা খাওয়ার মতো!
২০২৩ সালের নভেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারানোর পরও স্কালোনি বলেছিলেন, ‘এই সময়ে আমার অনেক কিছু নিয়ে ভাবার আছে। এই খেলোয়াড়রা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এটা বিদায় নয়, তবে আমাকে ভাবতে হবে। কারণ প্রত্যাশার মানদণ্ড এখন অনেক উঁচু। জয় ধরে রাখা কঠিন, আর এই খেলোয়াড়রা সেটাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।’
যদিও পরে ২০২৪ সালে তিনি শেষ পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করেন। তবে সেই সময়ও ২০১৮ সাল থেকে জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মানসিক ক্লান্তি এবং নতুন চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার কারণে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। সেই পরিস্থিতি এখন কিছুটা ভিন্ন। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আলোচনা চলছিল– আর্জেন্টিনা আবার শিরোপা জিতলে নতুন চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে। তবে একইসঙ্গে স্কালোনি প্রকাশ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দায়িত্বে থাকলে তাকে নতুন করে একটি দল গড়তে হবে।
মেটলাইফ স্টেডিয়াম ছাড়ার আগে তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টিকে খুব জটিল বলে মনে করি না। তবে প্রতিটি প্রক্রিয়ারই একটি শেষ আছে। এই যাত্রা ছিল অসাধারণ, অবিশ্বাস্য। ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’ কথাগুলো বলার সময়ই আবেগে ভেঙে পড়েন স্কালোনি। সবমিলিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে স্কালোনির শেষের সময় ঘনিয়ে আসার ইঙ্গিতটা হয়তো দ্রুতই বাস্তব রূপ নেবে!