Jahirul Hasan
প্রকাশ : Aug 22, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে ‘আক্রমণাত্মক’ সামরিক নীতিতে ইরান

প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে ‘আক্রমণাত্মক’ সামরিক নীতির  ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশটির সামরিক মতবাদ ধীরে ধীরে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ অবস্থান থেকে ‘আক্রমণাত্মক’ নীতির দিকে সরে যাচ্ছে। 

একই সঙ্গে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটিতে কোনও স্থল অভিযান হলে মার্কিন সেনা হত্যা বা আটক করতে পারলে পুরস্কার দেওয়ার পরিকল্পনাও প্রস্তুত করা হয়েছে।

শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া।

তিনি বলেন, অতীতে ইরানের সামরিক মতবাদ মূলত প্রতিরক্ষামূলক ছিল। তবে সাম্প্রতিক ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ এবং ‘৪০ দিনের যুদ্ধের’ অভিজ্ঞতায় সেই অবস্থানে ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে।

তিনি বলেন, “আমাদের দেশের সামরিক মতবাদ অতীতে প্রতিরক্ষামূলক ছিল। কিন্তু এই দুই যুদ্ধের সময় ধীরে ধীরে আমরা দেখেছি, সামরিক মতবাদ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।”

তবে আক্রমণাত্মক সামরিক মতবাদ গ্রহণের অর্থ সব ক্ষেত্রে আগাম হামলা চালানো নয় বলে স্পষ্ট করেন ইরানের এই সেনা কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, এর অন্যতম দিক হলো শত্রুর হামলার দ্রুত ও শক্তিশালী জবাব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে প্রাথমিক হামলার চেয়েও বিস্তৃত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া।

আকরামিনিয়া দাবি করেন, যুদ্ধের একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে সরাসরি প্রবেশের আগেই ইরান জর্ডানে থাকা একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। তার দাবি, ওই হামলায় মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম, স্থাপনা ও জনবলের ‘গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি’ হয়।

ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, নতুন এই সামরিক মতবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- ইরানের ওপর কোনও হামলা হলে তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা আঘাত করা। সেই জবাব শুধু প্রতিপক্ষের হামলার সমপরিমাণ না হয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

তার মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে দ্রুত ও বিস্তৃত পাল্টা হামলা এবং কিছু ক্ষেত্রে আগাম অভিযান পরিচালনার মধ্য দিয়ে ইরানের সামরিক মতবাদের এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে।

মার্কিন সেনা হত্যা বা আটকে পুরস্কারের পরিকল্পনা
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান মোকাবিলায় সেনাবাহিনী বিশেষ পুরস্কার কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে বলেও জানান আকরামিনিয়া।

তিনি বলেন, কোনও মার্কিন সেনা ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে তাকে হত্যা বা আটক করতে পারলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য অথবা বৈধভাবে শিকারি অস্ত্রের মালিক বেসামরিক নাগরিককে ৫ বিলিয়ন তোমান পুরস্কার দেওয়া হবে। তার হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার ডলার।

নারীদের কেউ কোনও মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করতে পারলে পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করে ১০ বিলিয়ন তোমান, অর্থাৎ প্রায় ৫৩ হাজার ডলার করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আকরামিনিয়া আরও বলেন, অভিযানে ব্যবহৃত অস্ত্রটিও তার মূল্যের দ্বিগুণ দামে কিনে নেওয়া হবে। পরে অস্ত্রটি মালিকের নামসহ সামরিক জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে এবং তাকে একই ধরনের একটি বিকল্প অস্ত্র দেওয়া হবে।

সামরিক কমান্ড কাঠামোয় পরিবর্তন
ইরানের সামরিক বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোতেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান আকরামিনিয়া।
তিনি বলেন, খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সকে সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সঙ্গে একীভূত করার লক্ষ্য হলো ইরানের সামরিক বাহিনীকে আরও দ্রুতগতিসম্পন্ন ও কার্যকর করা। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং ঐক্যবদ্ধ কমান্ড ব্যবস্থা জোরদার হবে।

তার দাবি, এই একীভূত কাঠামোর ফলে হুমকির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখার মধ্যে সমন্বয়ও আরও কার্যকর হবে।

কাতারে নিখোঁজ তিন ইরানি পাইলট
ইরানের চারজন এসইউ-২৪ যুদ্ধবিমানের পাইলটের বিষয়ে কাতারের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান আকরামিনিয়া।

তিনি বলেন, কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় অংশ নেওয়া চার পাইলটের একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ কাজেমি নিহত হয়েছেন এবং পরে তাকে ইরানের শিরাজ শহরে দাফন করা হয়েছে। তবে বাকি তিন পাইলটের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

আকরামিনিয়া বলেন, বিষয়টি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনী কাতার এবং আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও আইনি মাধ্যমে অনুসরণ করছে।

আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী কাতারকে ওই তিন পাইলটের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে, দাবি ইরানের
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলেও দাবি করেন আকরামিনিয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।

তার দাবি, ওয়াশিংটনের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই এই আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

আকরামিনিয়া বলেন, ভবিষ্যতে ওই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরে রেখে একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠাই প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের প্রভাব আগের তুলনায় কমেছে।

ইরানের সেনাবাহিনীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দেশটি তার সামরিক কৌশল ও কমান্ড কাঠামো নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে। প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আরও সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক কৌশলে যাওয়ার এই ঘোষণা ভবিষ্যতে ইরানের আঞ্চলিক সামরিক কর্মকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

 সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গ্রামীণ ভারতে কাজে লাগবে স্টারলিঙ্ক, দাবি ইলন মাস্কের

1

ফ্যাসিস্টদের ফটোকপি বিএনপির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি : জামায়াত আমি

2

উত্তেজনা পেরিয়ে বেরোবিতে সম্প্রীতির বার্তা, একসঙ্গে উপাচার্

3

নির্বাচনী তফসিল আগস্টে, প্রথম ধাপের ভোট অক্টোবরে : ইসি আনোয়া

4

আজ এইচএসসিতে অনুপস্থিত ২৯ হাজার পরীক্ষার্থী, বহিষ্কার ৩০

5

হলে JCD লেখা নিয়ে প্রতিবাদ, কুবির শিক্ষার্থীকে জুনিয়রসহ মারধ

6

পাকিস্তান হাই কমিশনের বাইরের নিরাপত্তা স্থাপনা উচ্ছেদ করল ভা

7

কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তরুণী ও দুই ভাইবোনকে নির্যাতন, গ্র

8

তারেক রহমানের সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্যদের সাক্

9

বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনা শুধু ‘প্রস্তাব’, বা

10

বীমার ৪৪ লাখের আশায় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার পর গাড়ি চাপা দিলে

11

তিন বিভাগে ভারী বৃষ্টির আভাস

12

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে কাজ করছে সরকার

13

ঐতিহাসিক জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন

14

একনেকে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকার ১০ প্রকল্প অনুমোদন

15

বিশ্বকাপ জয়ে বাঁধভাঙা উল্লাস, ভূমিকম্পের মতো ‘কম্পন’ অনুভূত

16

পর্তুগালের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা, আছেন বাংলাদেশে

17

২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত কোচ থাকতে ‘চুক্তিপত্রে’ স্কালোনির স্বা

18

পারিবারিক জীবন নিয়ে ‘ঘরছাড়া’ মরিনহোর অকপট স্বীকারোক্তি

19

চাঁদে ঘাঁটি নির্মাণ প্রকল্পে ভারতকে পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র

20