জাগো কণ্ঠ ডেস্ক ১ মে ২০২৫ , ৫:৩৫ অপরাহ্ণ
মাহতাব চৌধুরী, নোবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ
যুগে যুগে মানুষ নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে নানা অসাধ্যকে সাধন করেছে। নির্মম বাস্তবতা আর নানা বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে মানুষ অর্জন করেছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। সাথে যদি থাকে আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং অনুপ্রেরণাদানকারী পরিবার-পরিজনের দোয়া ও ভালোবাসা তাহলে আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অর্জন করা যায় সাফল্য।
তেমনি এক সাফল্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলেন নোবিপ্রবির সমাজবিজ্ঞান বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মহিবুল ইসলাম স্যার। কিভাবে এক দরিদ্র ঘরের বহুসদস্যের পরিবারের ছোট সন্তান হয়ে নানা কঠিন বাস্তবতার ভিতর দিয়ে সংগ্রাম করেন। বহুপ্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ছাত্র জীবনে বারবার রেখেছেন মেধার স্বাক্ষর। স্কুল, মাদ্রাসা (দাখিল, আলিম) এরপর স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে বর্তমানে তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন। তাঁর জীবনের এই অর্জনের কৃতিত্ব তিনি দিয়েছেন তাঁর মা-বাবা, ভাই ও বোনদের। তাঁদের দোয়া ও ভালোবাসার ফলেই তিনি আজ এই পর্যায়ে এসেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্টে নিজের জীবনের বাস্তবতা শেয়ার করেন, তিনি আশা করেন তাঁর বাস্তব জীবন সংগ্রামের কাহিনি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
তাঁর উক্ত পোস্টে কমেন্ট করেন তাঁর শিক্ষার্থী, বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এছাড়াও কমেন্ট করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, তিনি বলেন, “You have always been an inspiration for us!”
জনাব মহিবুল ইসলাম স্যারের পোস্টটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলোঃ
“মানুষ তার স্বপ্নের চেয়ে বড়”
আর সেই স্বপ্নেরও ওপরে থাকে আল্লাহর রহমতের ছায়া—যা সীমাহীন, অগণিত, অচিন্তনীয়। আমি নিজেকেই তার উদাহরণ মনে করি।
গাছীর ঘরে ৬ষ্ঠ সন্তান হিসেবে জন্ম। এরপর খেজুর আর তালের রস জোগাড় করা বাবার হাত ধরে কখন যে মাঠ-ঘাট-গাছতলা হয়ে জীবন চিনতে শিখেছি, মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে ঘরের সবচেয়ে ছোট সন্তান হিসেবে ছিলাম বাবার পিছু পিছু হাঁটা এক ক্ষুদে ছায়া যে সারাদিন বাবার পিছে পিছে ঘুরে বেড়িয়েছে মাঠ আর গাছতলা।
কিন্তু আল্লাহ আমার জীবনে যিনি পাঠিয়েছিলেন সবচেয়ে বড় নিয়ামত হয়ে, তিনি আমার বড় বোন। প্রতিদিন মাঠ থেকে ফিরিয়ে আমাকে জোর করে বসাতেন পড়ার খাটে কিংবা মাটিতে—যেখানে জায়গা মেলে। কোনোদিন টেবিল ছিল না, তবুও সেই পাঠশালায় বোনের আদেশ ছিল অটল। তবে বাড়ির ছোটছেলে হিসেবে আমি ছিলাম জেদি, একরোখা। সেই শাসনের মুখে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছিলাম, “আমি ঠিকই পাশ করবো!”—এটা আমি নিজে মনে না রাখলেও মা ও ভাইবোনদের মুখে শুনেছি বহুবার।
সেই জেদ, সেই জোর—আল্লাহ যেন কবুল করে নিয়েছিলেন। প্রাথমিক জীবন পার করেছি একজন ভালো ছাত্র ও খেলোয়াড় হয়ে।
এরপর বড় বোন গর্ব নিয়েই তার সাবেক স্কুলে আমাকে নিয়ে গেছেন এবং আমি টপ করবো এমন নিশ্চয়তা দিয়ে বেতন মওকুফ করেই ভর্তি করে দিয়ে আসছেন। তবে কিছুদিন যেতেই বিপত্তি বাধে যখন বই কেনার ব্যাপার আসে। ওই মুহুর্তে আমার বাবা দারুন ক্রাইসিসে নিজের সমস্ত সম্বল আর দেনা করে জমি কিনে পুরা পরিবার তখন খাবার জোগাড় করতেই সংগ্রাম করতেছে আমার বই গাইড অনেক দূরের ব্যাপার৷
তবে তখনই আল্লাহ র বিশেষ রহমত হিসেবে হাজির হয় এলাকার মাদ্রাসার হুজুর। ভালো ছাত্র হিসেবে সুনাম থাকাই তারা সকল সুবিধা দিয়ে তাদের মাদ্রাসায় পড়ানোর প্রস্তাব দিলে পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার বোন না করতে পারেন নি আর বাবা মন থেকেই এটা প্রেফার করেছেন। বিনা খরচে (যাকাত, দানের টাকায়) ই মাদ্রাসায় পড়তে থাকলাম দুইবার মাদ্রাসা থেকে পাঞ্জাবি ও দিয়েছে শার্ট পরে যেতাম দেখে। তবে হুজুরদের সম্মান রাখার তৌফিক আল্লাহ আমাকে দিয়েছিলেন সব ক্লাসে প্রথম হয়ে দাখিলে জিপিএ-৫ পেয়ে মাদ্রাসার সুনাম আনতে পেরেছিলাম।
এরই মধ্যে শৈশব পেরিয়ে আমি কৈশোরে বাবার সাথে গাছে ওঠা, মাঠে খাটা আর নিয়মিত খেলাধুলা করা আমার শরীর তখন আফ্রিকান তাগড়া যুবকদের মত সুঠম। এইটাকে কাজে লাগিয়ে দাখিলের পর ৩ মাসের ছুটিকে দারুনভাবে ব্যাবহার করলাম। আমার মেজো ভাই তখন ভ্যান চালানো ছেড়ে সদ্য ঢালাইয়ের কাজে যান আমি এই সুযোগে ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম। তখন গ্রীষ্মের বাঙ্গী ফাটা গরম সেই সুবাদে আমি মূলত ভ্যানে করে মানুষের বাঙ্গী, তরমুজ এগুলো বাজারে নিতাম অবশ্য যাত্রী ও নিয়েছি। আমার ভ্যানের প্রথম যাত্রী রুপদিয়া বাজারের জ্যোতি লাইব্রেরি র দোকানদার মহিলা যাকে এখনো দেখি বাজারে গেলে। প্রথম দিনে প্যাডেল ঘুরিয়ে মোটামুটি ১১০ টাকা আয় করে ফেলি। এভাবে এই বন্ধের মধ্যে ৪ হাজার টাকা গুছিয়ে একটা ছাগল কিনে ফেলি।
এরপর দাখিলের ভালো রেজাল্টের সুনাম কাজে লাগিয়ে আলিমে ও একই ধরনের সুযোগ সুবিধার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আরেক মাদ্রাসায় ভর্তি হলাম। বয়:সন্ধিকালের নানাবিধ সমস্যা আকড়ে ধরার চেষ্টা করলো তবে সব টপকে পড়াশোনা ধরে রাখলাম সাথে বাবার সাথে কাজ।
এই সময়ে আমার মেজো ভাই আমাকে দারুন ভাবে সাপোর্ট করলেন। আমি আমার ভাইয়ের সাথে তখন একসাথে ঘুমাই আমাদের রান্নাঘরের পাশের খোপে। ভাই রাত করে বাসায় ফিরতো কিন্তু কখনো খালি হাতে ফিরতো না আমার জন্য কিছু না কিছু নিয়েই আসতো। বলতে গেলে আমি শুধু ভাই কিছু আনবে সেটার জন্যই রাত জেগে পড়তাম যে আনলে খাবো। এই সময়ে ভাইয়ের সাথে কিছুদিন ঢালাইয়ের কাজে গেছি যদিও আমি কোনোভাবেই এই শক্তপোক্ত কাজের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আর সাহস ও ছিলো না তবে ভাই একাই আমার কাজ করে দিছে প্রায় আমাকে বুঝতেই দেয় নি। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর অলৌকিক রহমতে আলিমে ও জিপিএ-৫ পেলাম।
তবে এর মধ্যে আমার জীবনে আমার সেজো ভাই এক অপরিচিত দুনিয়া আমার সামনে এনে দাড় করিয়ে দিলো। তখন ও আমি এডমিশন কী এটা জানি না ভাই আমাকে বললো আমার স্বপ্ন ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো কিন্তু পারিবারিক বাস্তবতায় পারি নি তবে এখন আমার স্বপ্ন তুই। এই মুহুর্তে পরিবারের সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে আমাদের পারিবারিক অবস্থা বেশ স্টাবল হয় আসলে। যাই হোক ভাই আমাকে নিয়ে গেল যশোর ভর্তি করালো সাইফুর’সে উঠায় দিয়ে আসলো মেসে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে বড় ভাইবোনের ডানার নিচে বড় হওয়া আমি বাড়ি ছেড়ে থাকতে পারি নি কান্নাকাটি করে চলে এসেছি বাড়ি। ভাই রেগে আগুন তখন আবারও আমার সেই জিদ আর এরোগেন্স সোজা বলে দিলাম আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে দেখালে তো হচ্ছে।
জেদ ছিল, চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই জেদে আমি ৩ মাস জীবনকে একপাশে রেখে শুধু পড়েছি। রোজার রাতে, ক্লাসের পথে, যশোর শহরের ব্যস্ত রাস্তা—সবখানেই শুধু বইয়ের পাতা ছিল চোখে।
আল্লাহর অপার কৃপায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে ৮০তম হয়ে সুযোগ পেলাম। যেদিন মা-বাবা-বোন-ভাইয়ের চোখে সেই আনন্দের অশ্রু দেখলাম, সেদিন মনে হয়েছিল—আল্লাহর রহমতের সামনে আমাদের কল্পনা কতটাই না ছোট!
হ্যাঁ, তখনো পর্যন্ত আমার স্বপ গ্রামের কোনো স্কুলে শিক্ষকতা করতে পারলে সেটা অনেক বড় প্রাপ্তি।
এর পর প্রাণের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে নতুন ভাবে জন্ম দিয়েছে,নতুনভাবে স্বপ্ন দেখিয়েছে, নতুন ভাবে গড়ে তুলেছে। মা কে শুধু বারবার বলেছি মা তুমি শুধু দুয়া করো যেব হল থেকে বের হওয়ার আগেই কিছু করতে পারি তাহলে আব্বার উপর চাপ পড়বে না। আমি চেষ্টা করেছি ঠিকই কিন্তু সবটাই আমার আব্বা মা র দোয়া আর আল্লাহর রহমত।
আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমার যা কিছু অর্জন তার পুরাটাই আমার আব্বা মায়ের দুয়া আর তার প্রেক্ষিতে আল্লাহ র খাস রহমত, আমি এর কোনোকিছুই নিজগুনে ডিজার্ভ করতাম না।
এতোকিছু বলার কারণ আজ আমি বিভাগের ছাত্রপরামর্শক হিসেবে দেখি, অনেক শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়, হীনমন্যতায় ভোগে। আমি শুধু বলতে চাই—আমাদের সীমাবদ্ধ কল্পনার চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা অনেক বড়, অনেক উত্তম। তাই স্বপ্ন দেখো, চেষ্টা করো, আর আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।
আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে তাঁর খাস রহমতের মাধ্যমে কবুল করেন। আমিন।
বাই দ্যা ওয়ে সেই ছাগল বিক্রি করে পরে একটা গরু কিনেছিলাম তাএপর সেটা বিক্রি করে একটা ল্যাপটপ আর বাকি টাকা দিয়ে ছোট গরু কিনেছিলাম যে কীনা আমাদের DREAM AGRO র ময়না, আমাদের সবর আদরের রুপা র মা!















