Jahirul Hasan
প্রকাশ : Jul 28, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

রাশিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্র-সেনা দিয়ে ‌‘আখের গোছাচ্ছে’ উত্তর কোরিয়া


ইউক্রেন ভূখণ্ডে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান বজায় রাখতে এবার বড় ধরণের কৌশলগত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। মস্কোর ফুরিয়ে আসা অস্ত্রাগার পূর্ণ করতে উত্তর কোরিয়া থেকে রাসায়নিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চালান জোরদার করার পাশাপাশি হাজার হাজার সেনা পাঠানোর তোড়জোড় শুরু করেছে পিয়ংইয়ং। এই অভূতপূর্ব সামরিক ও শিল্প অংশীদারিত্ব কেবল ইউরোপের রণক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে না বরং উত্তর-পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ফেলছে গভীর ও উদ্বেগজনক প্রভাব।

গোয়েন্দা তথ্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া তাদের কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ মডেলের কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং মোবাইল লঞ্চার রাশিয়ার কাছে সরবরাহ পুনরায় শুরু করেছে। শুধু তা-ই নয়, ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ জোরদার করতে অতিরিক্ত ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় সৈন্য মোতায়েনের প্রস্তুত নেওয়া হচ্ছে। ইউক্রেনের গোয়েন্দা সূত্রে সতর্ক করা হয়েছে, এসব অতিরিক্ত সামরিক সদস্যকে রাখার জন্য রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভোরোনেজ অঞ্চলে প্রয়োজনীয় আবাসন সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। একই সময়ে পিয়ংইয়ং তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা আগামী পাঁচ বছরে প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা স্পষ্টতই তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক রপ্তানির লক্ষ্যকেই নির্দেশ করে।

ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার এই প্রযুক্তির সরাসরি প্রয়োগ অস্ত্রগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে নাটকীয় ভূমিকা রাখছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে কেএন-২৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর নির্ভুলতার ক্ষেত্রে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছিল এবং এর লক্ষ্যভ্রষ্টতার হার ছিল প্রায় ১৫০০ মিটার পর্যন্ত। তবে রুশ প্রকৌশলীদের সাথে যৌথ কারিগরি সংশোধনের ফলে এই দূরপাল্লার অস্ত্রের নিখুঁত লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এর লক্ষ্যভ্রষ্টতার ব্যবধান নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ৫ মিটারে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন সীমান্ত এখন উত্তর কোরিয়ার সামরিক প্রযুক্তির জন্য একটি জ্যান্ত পরীক্ষার ময়দানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে উত্তর কোরিয়ার সশস্ত্র বাহিনী আধুনিক উচ্চ-তীব্রতার যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। একই সাথে তাদের নিজস্ব অস্ত্র ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ঘটাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার এসব কেএন-২৩ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৬০০ কিলোমিটার এবং কেএন-২৪ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরত্বের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ফলে যুদ্ধের এই আধুনিক সংস্কার পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া এবং সামগ্রিক এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।

রাশিয়ার এই বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র আমদানির অন্যতম মূল কারণ হলো নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার বিপর্যয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী ক্রমাগত আক্রমণের মুখে রাশিয়ার ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের বিপুল চাহিদার তুলনায় রাশিয়ার সামরিক কারখানাগুলো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা তাদের একটি বড় আকারের উৎপাদন ঘাটতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে ও ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে রকেট হামলা অব্যাহত রাখতেই মস্কো এখন সম্পূর্ণভাবে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সহায়তার ওপর ভরসা করছে।

এই বিশাল সামরিক সহায়তার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অভাবনীয় সুবিধা লাভ করছে। হিসাব মতে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত রাশিয়াকে অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে সহায়তা করার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া প্রায় ৭.৬৭ বিলিয়ন থেকে ১৪.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আসা এই বিপুল নগদ অর্থ এবং চীনা মূলধনের প্রবাহ উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের নতুন জোয়ার এনেছে। পিয়ংইয়ং শহরের আধুনিকায়ন, আবাসন প্রকল্প, এমনকি ডিজিটাল ও ইলেকট্রিক গাড়ির প্রসারই প্রমাণ করে, এই আন্তর্জাতিক কৌশলগত লেনদেন দেশটির অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে মূল ভূমিকা রাখছে।

অর্থনৈতিক সুবিধার বাইরেও রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া উন্নত সামরিক প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, পিয়ংইয়ংয়ের তৈরি আধুনিক পরমাণু-ডানাযুক্ত নতুন যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন প্রোগ্রামে রাশিয়া তাদের উন্নত এয়ার ডিফেন্স ও পারমাণবিক চালিকাশক্তি প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। এর পাশাপাশি, ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়ে ফিরে আসা হাজার হাজার উত্তর কোরীয় সেনা সদস্য রাশিয়ান কৌশল ও আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার শিখে এখন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছে। এই প্রক্রিয়া উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে যেকোনো আধুনিক যুদ্ধের জন্য আরও বেশি প্রশিক্ষিত ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।

দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার মূল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিভাবক ছিল চীন, তবে রাশিয়ার সাথে এই দূরদর্শী সামরিক অংশীদারিত্বের ফলে পিয়ংইয়ং এখন চীনের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পেরেছে। রাশিয়ার সহায়তায় নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তি ও সামরিক শক্তি মজবুত করায় মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের এই স্থায়ী সামরিক-শিল্প সহযোগিতা উত্তর কোরিয়াকে অনেকটাই স্বায়ত্তশাসিত করে তুলবে। 

সূত্র: এশিয়ান টাইমস

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পেলেন ইরানের সেই দুই নারী ফুটবলার

1

নেপালের আকাশে ভয় পেলেন অপু বিশ্বাস!

2

মাথা ব্যথার কারণ হেডকে নিয়ে যে পরিকল্পনা তাসকিনের

3

ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌ

4

সার্ক সক্রিয় করতে বাংলাদেশ-নেপাল একমত, জোরদার হচ্ছে সংসদীয়

5

বাংলাদেশকে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্ট

6

বেলুচিস্তানে পৃথক অভিযানে ৭ সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত

7

মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় আটকা, অসুস্থ ৪০ ইরানি নাবিককে নিয়ে এলো শ

8

ফিফা সভাপতির ওপর আস্থা হারিয়ে এবার পদত্যাগ করলেন শান্দোর চ্য

9

হাসানের ৮ উইকেটেই কাঁপছে অস্ট্রেলিয়া, তৃতীয় দিন শেষে বড় নায়ক

10

‘পাকিস্তানে ককরোচ পার্টির উত্থান হতে পারে’, সতর্কবার্তা নাকভ

11

হাফপ্যান্ট পরে, পায়ের ওপর পা তুলে নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করল

12

হজে বাংলাদেশের জন্য ব্যাকআপ আবাসন ১ শতাংশ বহালের অনুরোধ ধর্ম

13

আমি চেয়েছিলাম বলেই ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে: ট্রাম্প

14

মাসসেরার পুরস্কার জিতে কাভান সুলিভানের ইতিহাস

15

ঠাকুরগাঁও-১ উপ-নির্বাচনের ভোট সুষ্ঠু করতে সব ধরনের ব্যবস্থা

16

‘এমন সুযোগ-সুবিধা পেলে আমার ক্যারিয়ারটাও অন্যরকম হতে পারতো’

17

অনির্দিষ্টকালের বিরতিতে মেসি

18

পরিযায়ী পাখির আগমনকে সামনে রেখে প্রস্তুত হচ্ছে নোবিপ্রবির

19

হুথিদের থেকে সৌদিকে রক্ষায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে যুক্তরাজ্

20