পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন দ্বন্দ্ব নিরসনে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও উন্নয়নের জন্য কাজ করছে জাতিসংঘ। সেই জাতিসংঘ নিজের সংস্কার, মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে টানাপোড়েন, বাজেটসহ নানা সংকটে ভুগছে। সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি সংকট, জলবায়ু সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্ব সংস্থাটি যখন গভীর সংকট ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে তখন সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির হাল ধরেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বর্তমানে এ দায়িত্ব পালন করছেন। গত সেপ্টেম্বরে খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দিয়েছেন।
এ ছাড়া, জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের দায়িত্ব পালন করছেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা এবং ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম তালহা ইউনেস্কোর ৪০তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে আসা সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী নভেম্বর থেকে নতুন পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে। আর জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খান।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবদান রাখার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘ একটা সংকট মুহূর্ত পার করছে। এ সময়ে সাধারণ পরিষদের হাল ধরেছে বাংলাদেশ। এখান থেকে সফল উত্তররণ যদি সম্ভব হয় এটার ক্রেডিট বাংলাদেশ ডিজার্ভ করবে। আমরা দেশ হিসেবে ছোট হতে পারি, কিন্তু অবদানের দিকে থেকে আয়তনের তুলনায় বেশি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অবদান রাখছে এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জাতিসংঘের আরও অনেক সংস্থায় আমরা অবদান রেখে চলেছি।
এ কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম, জাতিসংঘের সংকট নিরসনে কাজ করবো। আমরা নির্বাচনী প্রচারে যুদ্ধসহ বিশ্বক নানা সংকট এবং এর সমধানে আমরা কিভাবে ভূমিকা রাখব বলেছি। এ বছরটা জাতিসংঘের জন্য খুবই জরুরি। বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি সংকট, জলবায়ু সংকট, এআই-এর মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ইউএন ৮৯ রিফর্মসহ জাতিসংঘের টপ টু বটমে একটা সংস্কার হবে। বাংলাদেশের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণে সিদ্ধান্ত এখনো আটকে রয়েছে। তবে আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই একটা সিদ্ধান্ত পাব।
আজ জাতিসংঘ দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর যাত্রা শুরু করেছিল জাতিসংঘ। এই সংস্থা কালের পরিক্রমায় কলেবরে অনেক বেড়েছে। ৫১টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৯৩।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের তিন বছরের মাথায় ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। প্রথম থেকেই বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সমর্থক বাংলাদেশ সবসময় জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে এবং করছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অবদান রাখছে এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
গত ২ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এক ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান বলেছিলেন, ‘বিশ্বের সব সমস্যার সমাধান দ্রুত ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে শেষ করা সম্ভব না–ও হতে পারে। তবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি থাকবে না। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সুযোগ কাজে লাগাতে জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সংলাপকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবো।’
খলিলুর রহমান বলেছিলেন, ‘সব সমস্যার দ্রুত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা ভাবার মতো সরল ব্যক্তি আমি নই। কিছু বিষয় রয়েছে, যা সমাধান ছাড়া থেকে যাবে। কিছু বিষয় থাকবে, সেগুলোর সমাধান পেতে আমাদের সময় লাগতে পারে। তার মানে এই নয় যে যেখানে আমরা পারি সেখানে সহাবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা আমরা করব না। সেটা করার চেষ্টাই আমি অব্যাহতভাবে করে যাব।’
জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর সহযোগিতা প্রত্যাশা করে খলিলুর রহমান বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি, সদস্যরাষ্ট্রগুলো যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে আমার কাজ সহজ হয়ে যাবে।’
এর আগে, ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ চলতি বছরের শেষে শেষ হওয়ার কথা। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে তার মেয়াদ। আর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই কূটনৈতিক সংস্থার হাল ধরবেন নতুন একজন।
আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী, এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে কাউকে বেছে নেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। জাতিসংঘ প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন আটজন। কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান, জাতিসংঘে গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচাল আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি, ইকুয়েডরের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইভন আ-বাকি, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা গারসেস, জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি উগান্ডার ওলার ওতুনু, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লানা নুসেইবেহ।
উত্তরসূরি নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে সমর্থন নিয়ে টানাপোড়েনের কারণে প্রতিযোগিতা জটিল হয়ে উঠেছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দুটি মেয়াদে তার দায়িত্বকাল প্রথমে করোনাভাইরাস মহামারি, পরে যুদ্ধের কারণে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আর তাই তার উত্তরসূরিকে কার্যত একটি সংকটাপন্ন সংস্থার দায়িত্ব নিতে হবে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—প্রত্যেকেই জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
জাতিসংঘ এখন তীব্র বাজেট সংকটে রয়েছে। বিশ্বমঞ্চে সংস্থাটির কর্তৃত্বও ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটির ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানোর চাপও দিচ্ছে।
এদিকে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, গাজায় ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ, ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং ইয়েমেনে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া লড়াই বিশ্বশান্তির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ এবং সাধারণ পরিষদের সভাপতি কতটা কার্যকারিতা ভূমিকা রাখতে পারবে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।