জাগো কণ্ঠ ডেস্ক ১৪ জুলাই ২০২৫ , ১২:২৯ অপরাহ্ণ
এম এস শবনম শাহীন,প্রধান প্রতিবেদক:
বরিশাল যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এক সময়কার দায়িত্বপ্রাপ্ত কো-অর্ডিনেটরের মুসা কালিম উল্লাহ যিনি বর্তমানে ফেনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে কর্মরত আছেন। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থান বদলের অভিযোগ ঘিরে চলছে ব্যাপক আলোচনা। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম থেকে ঠিকাদারি কাজ, সরকারি বাসা ভাড়া ফাঁকি, প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অপব্যবহার এমনকি কোটি টাকার সম্পদের মালিকানা—সব মিলিয়ে গোটা বিষয়টি এখন রীতিমতো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বরিশাল যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা ওই কো-অর্ডিনেটরের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো একটি টেন্ডারকেন্দ্রিক ঘুষ লেনদেন। অফিস কাম একাডেমিক ভবনের সংস্কার কাজে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের তদারকির জন্য তিনি যে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেন, তারা কাজের কিছু অসঙ্গতি দেখিয়ে ঠিকাদারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। পরে ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষক মো. সাইদুল ইসলামের নামে ৩ লাখ টাকার একটি চেক সংগ্রহ করা হয়, যা আসলে কো-অর্ডিনেটরের পূর্বপরিকল্পিত একটি ‘নাটক’ বলে দাবি উঠেছে। ঘটনার পর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিলে উভয় কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলেও নিশ্চিত করেছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
এছাড়াও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঈদুল আজহার ছুটির পর কর্মস্থলে যোগদানের নির্ধারিত তারিখে উপস্থিত না থাকায় অধিদপ্তর থেকে কো-অর্ডিনেটর মুসা কালিম উল্লাহকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও নানা অনিয়ম দেখা গেছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীদের আবাসিকে প্রথম দিন থেকেই খাবারের ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও, সেখানে তা চালু করা হতো দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন থেকে। প্রশিক্ষণ শেষ হবারও দুই-তিন দিন আগেই অংশগ্রহণকারীদের বিদায় করে দেওয়া হতো। এই অনিয়ম বারবার প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগে উঠে আসে।
প্রশাসনিকভাবে কো-অর্ডিনেটর মুসা কালিম উল্লাহর ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনৈতিক ফাইল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হতো ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর মিলন দাসের মাধ্যমে। কো-অর্ডিনেটর মুসা কালিম উল্লাহ দীর্ঘ সময় সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করলেও তিনি কোনো ভাড়াও পরিশোধ করেননি বলে তীব্র অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও এই যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সহকর্মীদের সঙ্গে প্রায়ই তিনি গর্ব করে বলতেন, অধিদপ্তর ও সচিবালয়ে যারা আছেন তারা তার ‘জুনিয়র’। একজন কেন্দ্রীয় কো-অর্ডিনেটর হয়ে এমন মন্তব্যে কর্মস্থলে একধরনের বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি হয়।
তবে বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা মুসা কালিম উল্লাহ রাজনৈতিক সুবিধাবাদের চর্চাতেও পিছিয়ে ছিলেন না। অভ্যুত্থানপূর্ব সময় পর্যন্ত তিনি যশোরের প্রভাবশালী আওয়ামী নেতা শাহীন চাকলাদারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরে পরিস্থিতি পাল্টে গেলে তিনি জামাতপন্থী বলয়ে ঘনিষ্ঠ হন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা তাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কো-অর্ডিনেটর মুসা কালিম উল্লাহর বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় গ্রামের বাড়ি থাকলেও, বসবাস করছেন যশোর শহরের নিউমার্কেট এলাকার অভিজাত ভবন ‘রজনীগন্ধা’র নবম তলায়। পাঁচ বেডরুম, ড্রয়িং-ডাইনিংসহ অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিলাসবহুল আলিশান ফ্ল্যাটটির বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। ফ্ল্যাটে রয়েছে চারটি এসি যুক্ত রুম। সংশ্লিষ্ট ভবন এবং ফ্ল্যাটের ছবিও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কাছে রয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশ করার স্বার্থে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বরিশালসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত কো-অর্ডিনেটর কর্মকর্তা মুসা কালিমুল্লাহর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান। এখানেই শেষ নয়— একপর্যায়ে প্রতিবেদন প্রকাশ না করার শর্তে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ৫০ হাজার টাকার প্রস্তাব দেন তিনি।
তবে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে পরিস্থিতির মোড় ঘোরে। পরবর্তীতে তিনি তার ‘ছোটভাই’কে দিয়ে সাংবাদিকদের মোবাইলে ফোন করান। সেই ব্যক্তি ফোনালাপে স্পষ্টত সন্ত্রাসীসুলভ ভাষা ও আচরণ প্রদর্শন করেন, ভয়ভীতি দেখান এবং সরাসরি প্রতিবেদন বন্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।
ঘটনার এ ধরণ সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একদিকে সরকারি একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে সেই অভিযোগ প্রকাশ ঠেকাতে অর্থের প্রলোভন এবং পরে ভয়ভীতি প্রদর্শন—সবমিলিয়ে বিষয়টি এখন কেবল প্রশাসনিক নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নেও আলোচনার কেন্দ্রে।
একটি সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দায়িত্বে থেকে যেভাবে আর্থিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অপব্যবহার চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু বরিশালের কেন্দ্র নয়, গোটা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন দ্রুত সময়ের দাবি।
অনুসন্ধানী পর্ব: ১, প্রতিবেদন চলমান থাকবে…














