শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী নন্দা মালিনী মারা গেছেন। সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গান গেয়ে তিনি দেশটির মানুষের কাছে ‘প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, ২০ আগস্ট নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। আগামী ২৩ আগস্ট ৮৩ বছরে পা দেওয়ার কথা ছিল তাঁর।
নন্দা মালিনীর গান শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি, নিপীড়ন এবং জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে তাঁর গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
আশির দশকের উত্তাল সময়ে তাঁর আলোচিত ‘পবনা’ অ্যালবামের গানগুলো জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমে প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। অ্যালবামের গানগুলোতে সামাজিক নানা সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাঁর গান মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা হারায়নি; বরং কনসার্ট ও ব্যক্তিগতভাবে তাঁর গান শুনতে ভক্তদের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
১৯৪৩ সালের ২৩ আগস্ট শ্রীলঙ্কার কালুতারা জেলার একটি গ্রামে জন্ম নন্দা মালিনীর। তাঁর স্কুলজীবন কাটে কলম্বোয়। ১৯৫৬ সালে একটি কবিতা আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে সংগীতজগতে তাঁর পথচলার সূচনা হয়।
পরবর্তী সময়ে সামাজিক ন্যায়বিচারকে কেন্দ্র করে গান গেয়ে দেশজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক গান থেকে শুরু করে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান, তাঁর গানের বিষয়বস্তুতে উঠে এসেছে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা।
শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের এক অস্থির সময়ে তাঁর সংগীত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে বামপন্থী আন্দোলন, জাতিগত উত্তেজনা এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ—সবকিছুর প্রভাব তাঁর গানেও প্রতিফলিত হয়েছে। মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নিয়ে তাঁর ‘পবনা’ অ্যালবামকে এখনো শ্রীলঙ্কার সংগীত ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জীবনের শেষ দিকেও সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে সক্রিয় ছিলেন নন্দা মালিনী। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে তিনি প্রকাশ্যে সেই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান এবং একটি সমাবেশে গান পরিবেশন করেন। কয়েক মাসের ওই গণবিক্ষোভের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
নন্দা মালিনীর মৃত্যুতে শ্রীলঙ্কা সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁকে ‘আমাদের সময়ের সত্যিকারের এক সংগীত কিংবদন্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সূত্র: বিবিসি