জাগো কণ্ঠ ডেস্ক ৪ মে ২০২৬ , ১২:১২ পূর্বাহ্ণ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
হরি লুটপাটের মহোৎসব চলছে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গত বছরের আগস্টে দুর্নীতিবাজ পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিন হাসপাতালটির পরিচালকের দায়িত্বে আসার পর থেকে সরকারি বরাদ্দ লোপাট ইউজার ফি টিকেটের অর্থ আত্মসাত রোগী পাঠিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অংকের বাণিজ্য, সরকারি বরাদ্দের ওষুধ বিক্রি করে দেওয়া, নন ইডিসিএল ওষুধ ক্রয়ের নামে টেন্ডার করে এই খাতের টাকা লোপাট ভর্তিকৃত রোগীদের পথ্য ডায়েটের নামে নিন্ম মাণের খাবার দিয়ে মোটা অংকের আর্থিক বাণিজ্য করেন তিনি।
হাসপাতালের যন্ত্রপাতি অকেজো রেখে প্রতিনিয়ত মেরামত রক্ষণাবেক্ষণের নামে বছরে কয়েক কোটি টাকা লোপাট, ওষুধ ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি সরবরাহের দায়িত্বে বিভিন্ন কোম্পানীর কাছ থেকে ফ্রিজ টিভিসহ বিভিন্ন ধরণের দামী উপহাড় উপঢৌকুন গ্রহণ, কয়েকজন ডাক্তার নার্স নেত্রী ওয়ার্ড মাস্টার নিয়ে ঘুষ বাণিজ্যে লুটেরা সিন্ডিকেট তৈরী ও কতিপয় নার্স ও মহিলা ডাক্তরদের নিয়ে কারণে অকারণে দেশ-বিদেশে প্রমোদ ভ্রমনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে । তার এ সকল অনৈতিক কাজের কারণে হাসপাতালটিতে ভেঙ্গে পড়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থা। চিকিৎসা সেবা প্রত্যাশী রোগী হচ্ছেন সর্বশান্ত। ভুল চিকিৎসা দেয়ার কারণে রোগী মরে যাওয়ারও ঘটনা ঘটছে অহরহ।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার কারণে হাবিবা নামে সাত বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ভুল চিকিৎসা দেওয়ার দায়ে হাসপাতালের একজন নার্সেওর ওপর দায় চাপিয়ে অভিযুক্ত পরিচালক সেহাব নিজেকে বাঁচানোর বা নিজের বেপরোয়া অনিয়ম দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা করছেন। হাসপাতালের ২য় তলায় সার্জারি ওয়ার্ডে এই অনৈতিক ঘটনাটি সংঘটিত হয়। শিশুটি চলতি বছরের (১৭ জানুয়ারি) আঙ্গুলে বিদ্যুতাপৃষ্ঠ হয়ে প্রফেসর নুরুল্লাহর অধীনে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়। হাসপাতাল থেকে অভিযোগ করা হয় সংশ্লিস্ট নার্স ভুল ইঞ্জিকশন পুশ করার কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। পরবর্তীতে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির মাধ্যমে শিশুটির বাবা কামরুজ্জামানের সাথে আপোষরফা করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। ডা. সেহাব হাসপাতালটির দায়িত্বে আসার পর থেকে ভুল টিকিৎসা ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে অসংখ্য রোগহীর জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে।
ডা. সেহাব সিন্ডিকেটের সদস্য হাসপাতালটির টেকনিশিয়ান সাজেদুল এখন ইঞ্জিনিয়ার না হয়েও নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে। আর তাকে দিয়েই ডা সেহাব হাসপাতালের এমআরআই সিটিস্ক্যানসহ সকল ধরণের চিকিৎসা যন্ত্রপাতি মেরামতের নামে প্রতিনিয়ত লক্ষ লক্ষ টাকা লোপাট করছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের সেপ্টম্বর পর্যন্ত এখাতে প্রায় ৪ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
সূত্র জানায়, হাসপাতালটির বর্তমান পরিচালক ডাঃ মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন উক্ত টেকনিশিয়ান সাজেদুল ইসলামকে রহস্যজনক কারণে তৃতীয় শ্রেণির ১৬তম গ্রেড থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পদোন্নতি দিয়েছেন। উক্ত পরিচালক ডাঃ মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন স্বাক্ষরিত গত ১৮ নভেম্বর ২০২৫ ইং তারিখ শঃসোঃমেঃকঃহাঃ/প্রশাসন/২০২৫/৬৩২০ স্বারক মূলে এক অফিস আদেশে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত অত্র হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান (বায়োমেডিকেল) সাজেদুল ইসলামকে নিজ দায়িত্বেরও অতিরিক্ত হিসেবে ম্যানেজার মেইনটেনেন্স পদে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। শুধু তাই নয়, ওই অফিস আদেশে টেকনিশিয়ান সাজেদুল ইসলামের নামে পূর্বের জারিকৃত আদেশ বাতিল করা হয়। পরিচালক ডাঃ মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীনও উক্ত টেকনিশিয়ান সাজেদুল ইসলামকে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সর্বত্র পরিচয় করিয়ে দেন। সে কারণে সাজেদুল এখন আরও বেপরোয়া। তার সন্ত্রাসীমূলক বেপরোয়া আচরণে হাসপাতালের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারিগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। সাজেদুল ইসলাম ৫ আগস্টের পর আ’লীগের রাজনীতি বাদ দিয়ে বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছেন। বিএনপির অর্জিত সুনাম যাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গোপণে সেই কাজটিই ধুরন্ধর টেকনিশিয়ান সাজেদুল ইসলাম গংরা করে যাচ্ছেন। সিরাজগঞ্জ থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য যিনি বর্তমান ক্যাবিনেটের দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর নাম কথায় কথায় ব্যবহার করছেন সাজেদুল ইসলাম। তিনি নাকি তার চাচা। হাসপাতালের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারির সঙ্গে তার হিং¯্র আচরণও দৃশ্যমান। কথায় কথায় কর্মচারিদের শরীরে হাত দেন এবং তুলে নিয়ে যাওয়ার বা অপহরণের হুমকি দেন।
সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিব) কতিপয় নেতার তদ্বিরে সাজেদুল সোনার হরিণ নামক চাকুরিটি বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। তিনি ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর প্রথম চাকরিতে যোগদান করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ৩য় শ্রেণির একজন কর্মচারি হিসেবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল হাসপাতালে পদায়ন করা হয়। হাসপাতালে যোগদানের পরই নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সাবেক পরিচালক ডাঃ সফিউর রহমানকে আ’লীগের দোহাই দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে সরকারি কোয়ার্টার বরাদ্দ দিতে বাধ্য করেন। তিনি ৫ আগস্টের ছাত্র জনতার গণঅভ্যূত্থানের আগ পর্যন্ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। গণঅভ্যূত্থানে আহত ছাত্রজনতার চিকিৎসা সেবা না দিয়ে তাদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান। এ সময় অত্র হাসপাতালের তৎকালিন স্বাচিব নেতাদের সঙ্গে তাকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখা যায়। ওই সময় জরুরী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স ইনচার্জ ও নার্সিং সুপারিনডেন্ট শাহনাজ পারভীন এবং টেকনিশিয়ান সাজেদুল ইসলাম গংরা মিলে সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও নষ্ট করে দেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আক্রমনে আহত রোগীরা যখন তাদের জীবন বাঁচাতে জরুরী বিভাগে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে দ্রুত আসেন তখনকার বিভৎস দৃশ্য যাতে সিসি টিভিতে ধরা না পরে সে জন্য সিসি টিভির যন্ত্রাংশ ধ্বংস করে ফেলেন সাজেদুল ইসলাম। এতেও তিনি ক্ষ্যান্ত হননি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দয় আক্রমনে আহত রোগীদের সেবা প্রদানে বাধাও দেওয়া হয় তার নেতৃত্বে। প্রাথমিক চিকিৎসা না দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভয়ভীতি দেখানো হয়। জরুরী বিভাগ থেকে তাদের চিকিৎসা পত্রও দেওয়া হয়নি। এমনকি উক্ত সাজেদুল ইসলামের নেতৃত্বে মারাত্মক আহত, মুমূুর্ষু ও শরীরে একাধিক গুলিবিদ্ধ সঙ্কটাপন্ন শত শত রোগীর চিকিৎসা না দেওয়ার বিরুদ্ধে হাসপাতালে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। জুলাই গণভ্যুত্থানে আহত ছাত্রজনতার চিকিৎসার বিরুদ্ধে যে সাজেদুল ইসলাম ভয়ানক পরিস্থিতির তৈরী করেন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন হাসপাতালে কর্মরত সচেতন কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ।
ইসলাম মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মচারী। সে হিসেবে সরকারি বাসা বরাদ্দের সুযোগ নেই তার। কিন্তু তৎকালিন আ’লীগের প্রভাব বিস্তার করে তিনি বাসা বরাদ্দ নিয়েছেন। বাসা নং-১৩, জি-টাইপ, ব্লক-১৬ আগারগাঁও পাকা মার্কেট, শেরে বাংলানগর, ঢাকা। অপর এক সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ মার্চ উক্ত হাসপাতালে কর্মরত ২০জন কর্মচারি স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে পরিচালকের নিকট। যার ডায়েরী নং ৩১৫২।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২৪-২৫ অর্থ বছরে অক্সিজেন প্ল্যান্টের ভ্যাকুয়াম মেশিন মেরামতের জন্য ২ লাখ ৬০হাজার টাকা উত্তোলন করে কাজ না করেই সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করেন সাজেদুল ইসলাম। এছাড়া অটোক্লাব মেশিন মেরামতের ১ লাখ ২০ টাকাও আত্মসাৎ করেন তিনি। মেরামতকৃত যন্ত্রপাতি দুই একদিন পরেই পুনরায় নষ্ট হয়ে যায়। অর্থ্যাৎ সুক্ষ্ম কৌশলে সরকারের কোটি কোটি টাকা বছরের পর বছর আত্মসাৎ করা হলেও এ নিয়ে কারও যেন কোন মাথা ব্যথা নেই। এদিকে ২৫-২৬ অর্থ বছরে যন্ত্রপাতি মেরামতের ২৮ লাখ টাকা উত্তোলন করে দৈনিক পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে কোটেশন পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে হিসাব শাখার আরেক দুর্নীতিবাজ কর্মচারি মামুন অর রশীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সাজেদুল ইসলাম অর্থ আত্মসাৎ করেন।
সূত্র মতে, অনৈতিক উপায়ে লুটকৃত সরকারি অর্থ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপরোক্ত দুর্নীতিবাজ পরিচালক ডাঃ মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন গংরা ভাগবাটোয়ারা করে হজম করে বহালতবিয়তে রয়েছেন। যে কারণে ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। যথেষ্ট তথ্য প্রমাণাদি থাকার পরেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিবে এমন প্রত্যাশা দেশবাসীর। পাহাড় সমান অভিযোগের ব্যাপারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ সেহাব উদ্দীনের প্রতিক্রিয়া জানতে বেশ কয়েকবার তার মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি। অভিযুক্ত সাজেদুল ইসলামের মোবাইলে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজকে একজন জুলাই যোদ্ধা দাবী করেন।
অ/জ/হু/ক


















