রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে তা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে ভারত।
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ রাশিয়ার তেল ক্রয়কারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রেখে একটি নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কসংক্রান্ত বিল অনুমোদনের কয়েক ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি এ সতর্কবার্তা দেয়।
রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে তৈরি করা বিলটি বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়। এতে রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাত, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও দেশটির অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পাশাপাশি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত রাশিয়ার কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
বিলটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভারত ও চীনসহ রাশিয়ার বড় জ্বালানি ক্রেতারা এ ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইরানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিলটি এখন ট্রাম্পের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
ভারতের কড়া বার্তা
বিলটি পাসের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নয়াদিল্লি দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় বিষয়টি উত্থাপন করেছে ভারত।
নয়াদিল্লির বক্তব্য, রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে মার্কিন পদক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপরও পড়তে পারে। ভারতীয় পক্ষ এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে বলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, নিজেদের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ভারত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নতুন মার্কিন আইনের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার দেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাতের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
রাশিয়ার তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক ভারত রাশিয়ার তেলেরও বড় ক্রেতা। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর রাশিয়া তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল বিক্রি করতে শুরু করলে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো রুশ তেল কেনা বাড়ায়।
নয়াদিল্লি বরাবরই বলে আসছে, বিপুল জনসংখ্যা ও দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতির জ্বালানি চাহিদা মেটাতে তাদের নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এ কারণেই রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর জন্য পশ্চিমা চাপের মধ্যেও ভারত নিজেদের জ্বালানি নীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
ভারত অবশ্য বলছে, তারা একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করবে এবং বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে সরবরাহের উৎস নির্ধারণ করবে।
শুল্কের সিদ্ধান্ত এখনও ট্রাম্পের হাতে
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হওয়া মানেই ভারতের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে না। আইনটি কার্যকর হওয়ার জন্য এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন। এরপর কোন দেশ বা পণ্যের ওপর কী মাত্রায় শুল্ক আরোপ করা হবে, সেটি মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হয়েছে। এর আগে মার্কিন সিনেটেও বিলটি অনুমোদিত হয়েছিল। ফলে ট্রাম্পের স্বাক্ষর করলে রাশিয়ার জ্বালানি ক্রয় অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কেও প্রভাবের আশঙ্কা
নতুন এই পদক্ষেপ এমন সময়ে এলো, যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক আলোচনা চলমান। ফলে রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে সম্ভাব্য মার্কিন শুল্ক দুই দেশের বৃহত্তর বাণিজ্যিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলোও সম্ভাব্য উচ্চ ব্যয় ও সরবরাহসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার তেল কেনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ভারতের অবস্থান মূলত জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন চাপের মুখে নয়াদিল্লি কীভাবে রুশ তেল আমদানি, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা