দেশজুড়ে

নির্বাচনের আগেই জুলাই শহিদদের জাতীয় বীর ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের দাবি এক করুণ আর্তি, এক জাতির রক্তভেজা আবেদন

  জাগো কন্ঠ ২৭ নভেম্বর ২০২৫ , ৩:৪৩ অপরাহ্ণ

শীতের শেষপ্রহরের বাতাসে যখন রোদ দ্রবীভূত হয়ে সন্ধ্যার আলোয় হারিয়ে যাচ্ছিল, তখনই যেন শুনতে পাওয়া গেল এক দীর্ঘশ্বাস—একটি জাতির, যারা জুলাই-এর রক্তদাগ ধুয়ে ফেলতে পারে না, ভুলতেও পারে না। সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে জড়িয়ে ছিল জ্ঞানভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক এম এ বার্ণিকের ব্যথাভরা আর্তি। তাঁর বিবৃতি যেন কাগজে লেখা নয়—জুলাই শহিদদের রক্তের ওপরে তোলা অক্ষর, প্রতিটি বাক্যই যেন কবরফাটা আর্তনাদ।

তিনি বললেন—
জুলাই জাতীয় সনদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি যে অবহেলা দেখানো হয়েছে, তা জাতির জন্য অপমানের কালচিহ্ন। যেন ইতিহাসের বুকের ওপর কেউ এক মুঠো ধুলো ছুড়ে দিয়ে বলেছে—“তোমাদের রক্তের কোনো মূল্য নেই!”

জুলাই যোদ্ধারা, যারা বুক চিরে স্বাধীনতার নতুন বাতাস টেনে এনেছিল, আজও ‘জাতীয় বীর’ উপাধি পায়নি। তারা কেবল ইতিহাসের পাতার হাওয়ায় উড়ে যাওয়া নাম—এটাই কি তাদের প্রাপ্য? তাদের রক্ত কি মানুষের রক্ত ছিল না? তাদের স্বপ্ন কি মানুষের স্বপ্ন ছিল না?

যে রক্তের নদীর ওপরে দাঁড়িয়ে ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আজ নির্বাচন আয়োজন করছে, সেই রক্তের কাছে সামান্যতম নত হওয়া হয়নি—এটাই বার্ণিকের অগ্নিদগ্ধ যন্ত্রণা। তাঁর কণ্ঠ কাঁপছিল, যেন প্রতিটি শব্দের ভেতরে কোন এক শহিদের মা নিঃশব্দে কেঁদে উঠছে।

তিনি বললেন—
“নির্বাচনের পর কোন সরকারই এই কাজ করবে না। আগস্ট-জুলাইয়ের রক্ত শুকিয়ে গেলে কেউ আর স্মরণ করবে না সেই নামগুলো। তাই নির্বাচনের আগেই—হ্যাঁ, ঠিক এখনই—জুলাই শহিদ ও যোদ্ধাদের জাতীয় বীর ঘোষণার গেজেট প্রকাশ করতে হবে।”

এ দাবি কোনো রাজনৈতিক বাণী নয়; এটি জাতির সম্মিলিত আর্তি। রোদের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্ষতবিক্ষত প্রজন্মের আর্তনাদ। বার্ণিকের ভাষায়—
“যারা জীবন দিয়ে নতুন সূর্য আনলেন, তাদের না-স্বীকৃতির অন্ধকারে ঠেলে দেয়া মানে গোটা জাতির অস্তিত্বের ওপর অমর দাগ এঁকে দেওয়া।”

জুলাইয়ের রাত্রিতে যারা রাস্তায় পড়ে ছিলেন, তাঁদের নিথর দেহের ওপরে ঝরে পড়েছিল মায়ের আহাজারি, বাবার নির্বাক শূন্যদৃষ্টি, সন্তানের অব্যক্ত কাঁদন। সেই কাঁদন আজও বাতাসে রয়ে গেছে—অদৃশ্য অথচ তীক্ষ্ণ। সেই কাঁদন যেন ভোরের ধোঁয়ায় জমে থাকা শিশির, যাকে না দেখলেও বুকভরা শীতলতা অনুভূত হয়।

কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামো কি সেই কাঁদন শুনেছে?
রাষ্ট্র কি জুলাই শহিদদের ছেঁড়া জামার গন্ধ পেয়েছে?
রাষ্ট্র কি জানতে চেয়েছে, তাদের শেষ নিঃশ্বাস কেড়ে নেওয়ার মুহূর্তে তারা কী স্বপ্ন দেখেছিল?

আর তাই বার্ণিকের আবেদন আর আবেদন নয়—এ এক শোকবার্তা, এক মৃত্যুর আগের শেষ চিঠি। তিনি যেন বলছেন—
“গেজেট প্রকাশ করুন। দেরি করবেন না। ইতিহাস ক্ষমা করে, কিন্তু রক্ত করে না।”

যদি এখনো স্বীকৃতি না আসে, তবে জুলাই শহিদদের আত্মা কি শান্তিতে থাকবে?
তাদের মায়েরা কি চোখের জলের ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন?
এই জাতি কি কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে?

প্রতিবেদনের শেষ লাইনটির ভারে যেন পৃথিবী একটু থেমে যায়—

“জুলাই শহিদদের বীরত্বকে গেজেটে স্থান দিন—নইলে ইতিহাস আমাদের অক্ষমতা এক কালো অক্ষরে লিখে রাখবে, যেখান থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নেবে লজ্জায়।”