ক্যাম্পাস

সুবিধাবঞ্চিত ১১২ জন শিশুদের মাঝে “লুমিনারি”-র ঈদ উপহার বিতরণ।

  জাগো কণ্ঠ ডেস্ক ২ জুন ২০২৫ , ১:৫০ অপরাহ্ণ

মাহতাব চৌধুরী, নোবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ-

সমাজে একজন মানুষ হিসেবে মৌলিক সু্যোগ- সুবিধা, ন্যায্য অধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও এদেশের করুণ বাস্তবতা নির্মম। কিন্তু সমাজের সব শ্রেণীর মানুষেরা সমান অধিকার পায় না। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার এই যুগে সামাজিক বৈষম্য যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। যারা ধনী তারাই পাচ্ছে সকল সুযোগ সুবিধা, আর যারা দরিদ্র, এতিম, আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল তারা দিনের পর দিন বঞ্চিত হচ্ছে নিজের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা থেকে। এদের ভিতর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের সমাজের দরিদ্র, অসহায়, এতিম, অনাথ শিশুরা।

এই শিশুরা তাদের দৈনন্দিন চাহিদা থেকে বঞ্চিত, পর্যাপ্ত অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রতিনিয়ত তারা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে। এইসব অসহায় এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ❝লুমিনারি❞।

লুমিনারি এমন একটি সংগঠন যারা সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে কাজ করে। নোবিপ্রবির এই সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে নোবিপ্রবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যারা এই সংগঠনের সদস্য। তারা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একত্রিত করে বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় সপ্তাহের বন্ধের দিন পাঠদান করে থাকেন। তাদের পাঠদান কখনো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশান্তি প্রাঙ্গনে কিংবা গাছতলায় কিংবা একাডেমিক, অডিটোরিয়াম বিল্ডিংয়ের বারান্দায়। ছোট শিশুদেরকে অক্ষর জ্ঞান প্রদান, লিখা শিখানো, আবৃত্তি, রচনা ইত্যাদি শিক্ষা প্রদান করা হয়।

এছাড়াও শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি এই সংগঠনটি বিভিন্ন সময়ে শিশুদেরকে প্রদান করে উপহার সামগ্রী। লুমিনারি এর উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে ” ঈদুল আযহা ” উপলক্ষে ঈদ উপহার বিতরণ করা হয়েছে, গত ৩০/০৫/২০২৫ ইং রোজ শুক্রবার বিকেলে ক্যাম্পাসের শহীদ ক্যাডেট সার্জেন্ট রুমি ভবনে এই অনুষ্ঠান হয়।

লুমিনারির কার্যক্রম নিয়ে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন সংগঠনটির ডেপুটি ট্রেজারার রেবেকা সুলতানা। তিনি জানান, “‘লুমিনারি’_ প্রতিটি শিশু মানুষ হোক আলোর ঝর্ণাধারায়! এই স্লোগান নিয়ে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর এ ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শ্রদ্ধেয় সহকারী অধ্যাপক জনাব শফিকুল আলম স্যার এর অনুপ্রেরণায় এবং মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে কয়েকজন উদ্যোমী শিক্ষার্থীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় “লুমিনারী”।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুশিক্ষা প্রদানপূর্বক মানসিক বিকাশ সাধন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে অনুপ্রেরণা প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “লুমিনারি “।
বর্তমানে প্রায় ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবকের তত্ত্বাবধানে প্রায় ১২০ জন শিশু/ প্লেমেটস ( ক্লাস ১ থেকে ক্লাস ১০ ) নিয়মিত শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ – সুবিধা পাচ্ছে।

সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বিকাল ৩.০০ টায় নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসের প্রশান্তি পার্কে আমরা শিশুদের নিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনা করি। অনেকেরই মনে প্রশ্ন আসে, একদিনে আমরা কি বা শিখাতে পারি? প্রকৃতপক্ষে একদিনে আমরা তাদের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করি। তাদের মাঝেও যে অপার সম্ভাবনা, লুকায়িত মেধা ও প্রতিভা রয়েছে তাদের অবচেতন মনে তা জাগ্রত করাই আমাদের লক্ষ্য। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় অনেক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আমাদের কার্যক্রম বিস্তার লাভ করেছে।
প্রতি বছরের শুরুতে শিশুদের শিক্ষা উপকরন যেমন খাতা,কলম,পেনসিল ইত্যাদি বিতরণ করে তাদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে যুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সকল ধরণের সাহায্য – সহযোগিতা প্রদানের চেষ্টা করি।
তাছাড়া আমরা শিশুদের জন্য বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকি এবং পুরস্কারের ব্যবস্থাও করি। বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোতে আমরা তাদের নিয়ে চিত্রাংকন, আবৃত্তি, গান সহ বিভিন্ন কার্যক্রম করে থাকি।এছাড়াও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে আমরা বিগত বছরগুলোসহ শিশুদের চিত্রকর্ম প্রদর্শনীসহ পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করে আসছি।
এখানের অধিকাংশ শিশুরা মুসলিম হওয়ায় আমরা ঈদ উপলক্ষে ঈদ উপহারের ব্যবস্থা করি এবং শীতের সময় শীতবস্ত্র উপহার হিসেবে প্রদান করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শারীরিক এবং আর্থিক অংশগ্রহণই আমাদের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের কাছে অনুরোধ থাকবে সবাই যেন আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করে কার্যক্রমটিকে আরো এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করে।”

এছাড়াও সংগঠনটি নিয়ে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন সংগঠনটির কার্যকরী সদস্য শাহীনুর আক্তার। তিনি জানান, “লুমিনারি নিছক একটি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ নয়, এটি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর মানবিক চিন্তার ফসল। ২০১৫ সালে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সেই প্রান্তিক শিশুদের পাশে দাঁড়ানো, যাদের জীবন হয়তো নানা প্রতিকূলতায় ঢাকা। আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, প্রতিটি শিশুই এক একটি আলোর উৎস, শুধু তাদের পরিচর্যা করে সেই আলোটিকে প্রজ্বলিত করতে হয়। আমাদের স্লোগান “প্রতিটি শিশু মানুষ হোক আলোর ঝর্ণাধারায়” এই বিশ্বাসেরই প্রতিধ্বনি। আমরা এমন একটি মঞ্চ তৈরি করতে চাই, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে পারবে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে সাহস পাবে।

আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রতিটি শিশুর জন্য একটি শিক্ষিত ও সমতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে তারা তাদের ন্যায্য অধিকারগুলো পাবে। এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমরা মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেই: সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য মৌলিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা, তাদের স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করা। আমরা মনে করি, একটি সুস্থ ও শিক্ষিত প্রজন্মই একটি উন্নত সমাজের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

আমরা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করি। প্রতি শুক্রবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আমরা সাপ্তাহিক পাঠদান করি, যেখানে তারা স্কুলের পড়ালেখার পাশাপাশি নৈতিক ও জীবনমুখী শিক্ষা লাভ করে। এছাড়াও, আমরা অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করে শিশুদের স্কুলে ভর্তি হতে উৎসাহিত করি এবং তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ যেমন খাতা, কলম, বই বিনামূল্যে দিয়ে থাকি। শীতকালে আমরা তাদের শীতবস্ত্র দিই এবং ঈদ এলে ঈদ উপহারের মাধ্যমে তাদের আনন্দ বাড়িয়ে তুলি। শুধু তাই নয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের মাধ্যমে আমরা তাদের মানসিক বিকাশেও সাহায্য করি। স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশ সচেতনতা নিয়েও আমরা কাজ করি, যেমন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। বর্তমানে ১২০ জন শিশু আমাদের ‘প্লেমেটস’ হিসেবে এই সুবিধাগুলো পাচ্ছে এবং প্রায় ৪০ জন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক এই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

আমাদের অনেকগুলো পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা একটি স্থায়ী শিশু বিকাশ কেন্দ্র তৈরি করতে চাই, যেখানে শিশুরা নিয়মিত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ পাবে। আমরা বড় শিশুদের জন্য কম্পিউটার শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে চাই, যাতে তারা আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। মেধাবী কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা একটি স্কলারশিপ তহবিল তৈরি করতে আগ্রহী, যাতে তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ সুগম হয়। এছাড়াও, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহায়তায় আমরা শিশুদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা করছি।

প্লেমেটদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে লুমিনারি প্রতি বছরের মতো এবারও ১১২ জন প্লেমেটকে ঈদ উপহার প্রদান করেছে। দিনটি সত্যিই অন্যরকম ছিল। উপহার বিতরণের আগে আমরা সকলে মিলে গান গেয়েছি, আমাদের ছোট বন্ধুরা কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেছে। কেউ কেউ কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছে, যা শুনে আমরা অভিভূত হয়েছি। ওদের ভেতরের প্রতিভাগুলো যখন এভাবে প্রকাশ পায়, তখন মনে হয় আমাদের সামান্য চেষ্টা কতখানি অর্থবহ হয়ে উঠেছে। সেই দিনের নির্মল আনন্দ, শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ – সবকিছু মিলিয়ে এক অসাধারণ স্মৃতি তৈরি হয়েছে। এই আন্তরিক মুহূর্তগুলোই তো লুমিনারিকে একটি পরিবারের মতো বেঁধে রেখেছে।”

নো/বি/আই

আরও খবর: