জাগো কন্ঠ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৮:৪৮ পূর্বাহ্ণ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোটকে ঘিরে প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) পরিস্থিতির দায় এড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও মব ভায়োলেন্সকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে কমিশনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংস্থাটি।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের ঘাটতি স্পষ্ট।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. মাহফুজুল হক ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি : টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এ কথা বলেন।
লিখিত বক্তব্যে মাহফুজুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন নিজেই দেশের ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। অথচ এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে যে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা, লাইট ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে স্লিপ ফান্ডের মাধ্যমে বরাদ্দ করা অর্থ কিছু ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনানুষ্ঠানিক নির্দেশে উত্তোলন করে উপজেলা কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। পরে সেই অর্থের সামান্য অংশ অবকাঠামো সংস্কার বা লজিস্টিক ক্রয়ে ব্যবহার করা হলেও বড় অংশ আত্মসাতের নির্ভরযোগ্য তথ্য টিআইবি পেয়েছে।
সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলাকে দায় এড়ানো উল্লেখ করে মাহফুজুল হক বলেন, তফসিল ঘোষণার আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সংঘর্ষ, মব ভায়োলেন্স এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। অতীতের জাতীয় নির্বাচনে সহিংসতাপ্রবণ এলাকা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব জেলায় সহিংসতা বেশি ছিল, সেসব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাতেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এমন বাস্তবতায় সম্ভাব্য এক প্রার্থীর হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, এতে নির্বাচনের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। এই বক্তব্যকে দায়িত্বহীন ও বাস্তবতা-বিবর্জিত উল্লেখ করে টিআইবি বলেছে, এ ধরনের অবস্থান কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অনীহা এবং ঝুঁকিকে খাটো করে দেখার প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, নিবন্ধন স্থগিত থাকায় একটি বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা এবং তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর মধ্যেই সহিংসতার আশঙ্কা বাড়লেও কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো সমন্বিত ও প্রতিরোধমূলক কৌশল দৃশ্যমান নয়।
মাহফুজুল হকের মতে, নির্বাচন পরিবেশ সৃষ্টি শুধু ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তফসিল ঘোষণার আগের সময় থেকেই সহিংসতা, ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তা দূর করতে দৃঢ় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, যা বাস্তবে দেখা যায়নি।
টিআইবি মনে করে, সহিংসতা ও নিরাপত্তা সংকটকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত করে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অর্থ ব্যবহারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং সহিংসতার প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট— উভয় প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে টিআইবি।

















