মতামত

উন্নয়ন প্রচারের চেয়ে দুর্নীতি রোধ জরুরি

  জাগো কণ্ঠ ডেস্ক ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ , ৩:১৬ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান সরকারের টানা ১৩ বছরের শাসনে বদলে গেছে বাংলাদেশ। নানা মাত্রায়, নানা সূচকে বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক সব সূচকেই বাংলাদেশের সাফল্য বিস্ময়কর। গড় আয়, গড় আয়ু, জিডিপি—সবকিছুই বেড়েছে। ডলারের রিজার্ভ বেড়েছে। আর সামগ্রিকভাবে এই সাফল্যের স্বীকৃতও মিলেছে।

বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এই সময়ে অবকাঠামো খাতে নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। নিজেদের টাকায় বানানো পদ্মা সেতু তো এখন বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে গেছে।

এছাড়া মেট্রোরেল, কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বদলে দেবে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্র। গ্রামেগঞ্জে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টে গোটা বাংলাদেশই এখন দারুণ এক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায়।

যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতির সুফল পৌঁছে গেছে গ্রামেগঞ্জেও। অজপাড়াগাঁয়ে উৎপাদিত পণ্যও এখন দ্রুতই পৌঁছে যাচ্ছে ভোক্তার টেবিলে। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। এই সাফল্যে এখন ঘরে ঘরে সচ্ছলতা।

তবে এত উন্নয়নের পরও বৈষম্য কমেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বেড়েছে। করোনার ধাক্কায় নতুন করে অনেকে দরিদ্র হয়েছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। তবে করোনা বা যুদ্ধেও কিছু মানুষের কিছু যায় আসে না।

দেশের অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু মানুষের সম্পদ বেড়েছে। আমাদের চারপাশে এখন আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়া মানুষের ছড়াছড়ি। ব্যবসা-বাণিজ্য করে বড়লোক হওয়া এক কথা, আর স্রেফ লুটপাট আর দুর্নীতি করে অর্থশালী হওয়া আরেক বিষয়। বাংলাদেশে এখন লুটপাট করে বড়লোক হওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি।

উন্নয়নের সুফল যেমন ঘরে ঘরে পৌঁছেছে, দুর্নীতিও পৌঁছে গেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে, বাংলাদেশের অগ্রগতি দ্রুততর হতে পারতো।

পত্রিকা খুললেই, ‘কলেজ করণিকের হিসাবে ২৪ কোটি টাকা’, ‘চট্টগ্রাম ওয়াসার কোটিপতি গাড়িচালক’, ‘কুলি থেকে কোটিপতি’, ‘রমনা থানার ওসির কোটি টাকার সম্পদ’, ‘টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ ও স্ত্রীর বিপুল সম্পদ’—এই ধরনের শিরোনাম চোখে পড়বে। কখনো দুদকের অনুসন্ধান, কখনো গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এমন সবখবর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোটিপতি গাড়িচালক মালেকের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি আপনারা। তবে আমি নিশ্চিত পত্রিকার খবরে যা আসে তা ডুবে থাকা হিমশৈলের সামান্য চূড়া মাত্র। রমনা বা টেকনাফ থানার ওসি না হয় ঘটনাক্রমে ধরা খেয়ে গেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের কয়জন ওসির আয়ের সাথে ব্যয় মিলবে?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মালেক তো আর একজন নন। ওয়াসায়ও কোটিপতি গাড়িচালক নিশ্চয়ই আরও আছে। অত দুদকের অনুসন্ধান দরকার আপনি চোখ কান খোলা রাখলেই এমন অসংখ্য আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়া মানুষের সংখ্যা দেখতে পাবেন।

বেতন পান ৫০ হাজার টাকা, বাসা ভাড়া দেন ৬০ হাজার টাকা, সন্তান দেশে বা বিদেশে দামি স্কুলে পড়ে—এমন হয়তো আপনার পাশের বাসাতেই থাকেন—এমন লোক হয়তো আপনার পাশের বাসাতেই থাকেন।

প্রবাসী শ্রমিকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে আর আমাদের লুটেরারা টাকা পাচার করে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়ায় বেগমপাড়া বানাচ্ছে।

দুয়েকজন পি কে হালদার আলোচনায় আসেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিয়ত হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে আর আমাদের লুটেরারা টাকা পাচার করে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়ায় বেগমপাড়া বানাচ্ছে।

দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতির স্বার্থেই দুর্নীতি, অনিয়ম আর লুটপাটের রাশ টানা দরকার। কিন্তু পত্রিকায় দেখলাম সরকার তাদের উন্নয়নের ব্যাপক প্রচারে নতুন প্রকল্প নিচ্ছে। এর আগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচারে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বা করছে।

এবার নতুন প্রকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আসছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর। তারা দেশের ৪৯২টি উপজেলায় একটি করে এলইডি ডিসপ্লে বসাতে চায়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩২ কোটি টাকা! প্রকল্পটি এখনো একনেকে ওঠেনি। তবে খবরে দেখলাম, সেপ্টেম্বরেই উঠতে পারে।

এর আগে তথ্য মন্ত্রণালয় ১০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সাল থেকে ভ্রাম্যমাণ এলইডির মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচার করে। এছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে এলইডি ডিসপ্লের মাধ্যমে ১৯ জেলায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচার করছে।

সরকার অবশ্যই তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচার করবে। জনগণের কাছে পৌঁছে দেবে। মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি মাধ্যম, গণমাধ্যম তো আছেই।

তারপর একই ধরনের প্রচারণায় সরকারের আলাদা তিনটি মন্ত্রণালয়ের আলাদা তিনটি প্রকল্প অপচয় বাড়াবে শুধু। চারদিকে যখন কৃচ্ছ্রতার বাণী, তখন প্রচারণার পেছনে এত টাকা ব্যয় কোনো কাজের কথা নয়। তারচেয়ে বড় কথা হলো, নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরনের প্রচারণার নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

সরকারের প্রচারণা শেষ পর্যন্ত দলীয় প্রচারণায় পর্যবসিত হবে। তারচেয়ে ভালো সরকারি দলের নেতারা যদি জনগণের সাথে যোগাযোগ আরও বাড়ান, তাদের পাশে থাকেন; তাদের মুখে মুখেই ছড়াবে সরকারের উন্নয়নের বয়ান। তবে দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে, উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কখনোই পৌঁছাবে না।

প্রভাষ আমিন ।। বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

আরও খবর: