জাগো কণ্ঠ ডেস্ক ৬ এপ্রিল ২০২৩ , ৭:১৫ পূর্বাহ্ণ
ড্রেজার মেশিনের পর ট্রাক্টর দিয়ে নির্বিচারে পাথর উত্তোলনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার ডাহুক নদী। নদীর গতি বন্ধ করে দিন-রাত তোলা হচ্ছে পাথর। এতে করে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে নদীর বুক। ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে ডাহুক নদীর চিরচেনা রূপ। বৈচিত্র্যের সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। বর্ষা মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতেই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে দুই পাড়ের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ক্ষতির মুখে পড়ে বিভিন্ন ফসল। নদী সংলগ্ন অনেকের জমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কয়েক বছর ধরে ডাহুক নদী থেকে পাথর তুলতে ব্যবহার হতো অত্যাধুনিক ড্রেজার মেশিন। মাটির ২০০-২৫০ ফুট গভীর থেকে পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর বিভিন্ন জায়গায় বিশাল বিশাল গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে পাথর উত্তোলন করলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার বিষয়ে বারবার সতর্ক করে আসছেন পরিবেশবিদরা।
২০১৯ সালের ১৩ জুন পঞ্চগড়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী যোগদানের পরপর পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে বন্ধ হয়ে যায় ড্রেজার মেশিনে পাথর উত্তোলন। এতে করে নদীটি ড্রেজার থেকে রক্ষা পেলেও গত বছর আগস্টের শেষের দিকে পুলিশ সুপারের বিদায়ের পর এখন ড্রেজার মেশিনের পরিবর্তে নদীতে অভিনব পদ্ধতিতে ট্রাক্টর দিয়ে চলছে পাথর উত্তোলন।

জানা যায়, শালবাহান ইউনিয়নের মাঝিপাড়া, গুচ্ছগ্রাম, লোহাকাচী, বালাবাড়ি, কালিতলাসহ কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ও বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের বালাবাড়ি, কাটাপাড়া, সরকারপাড়া ও হারাদিঘী এলাকায় ডাহুক নদীতে পাওয়ার ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলন করছে স্থানীয় কিছু অসাধু পাথর ব্যবসায়ী। এতে করে নদীটি গভীরতা ও গতিপথ হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নাব্যতা হারিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ডাহুক নদী।
ডাহুক নদী ঘুরে দেখা যায়, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নির্বিচারে ট্রাক্টর দিয়ে তোলা হচ্ছে পাথর। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, নদীর প্রায় ১০০টি পয়েন্টে পাথর তোলা হচ্ছে। প্রতিদিন এরকম একটি সাইট থেকে তোলা হয় অন্তত ৩০-৪০ ট্রলি পাথর। প্রশাসনের ভয়ে রাত ৩টার পর থেকে সকাল পর্যন্ত চলে এই পাথর তোলার কাজ। ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলন করার ফলে কর্মহীন হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। ফলে ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলন না করার দাবি জানিয়েছেন সেখানকার পাথর শ্রমিকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু পাথর শ্রমিকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ডাহুক নদীতে পাওয়ার ট্রাক্টর দিয়ে পাথর তোলা হচ্ছে। এ পাথর উত্তোলনের কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন ও জনপ্রতিনিধি। তারা এসব সাইট পরিচালনা করার জন্য নিয়োগ করেছেন ২০ থেকে ২৫ জন যুবক। তারা ট্রলি প্রতি ছয় শ টাকাসহ বিভিন্ন অংকের টাকা তুলে নিচ্ছে। তবে, এসব প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধির নাম বললে সাইটে আর পাথর তুলতে পারবেন না বলেও জানান শ্রমিকরা।

রফিকুল ইসলাম, রুহুল আমিনসহ আরও কয়েকজন পাথর শ্রমিক জানান, ডাহুক নদীতে ডুবে পাথর উত্তোলন করতো তারা। এতে এক গর্তে কমপক্ষে ৩০-৪০ জন মানুষের প্রয়োজন হতো। এখন ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলন করার কারণে মানুষের প্রয়োজন হয় মাত্র ৮-১০ জনের। এতে পাথর শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছেন বলেও জানান তারা। এ কারণে, প্রশাসনের কাছে ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধেরও দাবি জানান তারা।
সম্প্রতি আফরোজা বেগম নামের এক নারী অভিযোগ করে বলেন, বালাবাড়ি-সরকার পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাহুক নদীতে ট্রাক্টর দিয়ে পাথর তোলার কারণে নদীর পাড় ভেঙে তার জমি ও মেহগনি গাছের বাগান দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। শালবাহান ইউনিয়নের বালাবাড়ি এলাকায় থাকা তার জমির অধিকাংশই ডাহুক নদীতে চলে গেছে। একইসঙ্গে তার মেহগনি গাছের বাগানের একটি অংশও নদীতে বিলীন হয়েছে। এমনকি, নদীর বর্তমান গতিপথ প্রবাহিত হচ্ছে তার জমির উপর দিয়ে।
শালবাহান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম বলেন, মাঝে কিছুদিন ট্রাক্টর দিয়ে পাথর তোলা হয়েছিল। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিদের্শনায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কালিতলা ব্রিজ ও ডাহুক ব্রিজের ধারে যেসব ক্ষতি হয়েছে তার কারণে ট্রাক্টর দিয়ে পাথর তোলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে, বুধবার (৫ এপ্রিল) ডাহুক ব্রিজ এলাকা থেকে বালু ও মাটি কেটে পাথর তোলার অপরাধে তিনজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালত সাজা প্রদান করেছেন।
ডাহুক নদীতে ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সম্পৃক্ত রয়েছেন, এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অসম্ভব। ইউনিয়নের জনগণের সেবা করতে করতেই সময় পাওয়া যায় না। কিছু প্রতিপক্ষ রয়েছে, তারাই এসব বলে বেড়াচ্ছেন। নদীতে ড্রেজার কিংবা ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে বারবার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সনাতন পদ্ধতি নদীতে পাথর তুলতে বাধা নেই। যারা এসবের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করছি।
তেঁতুলিয়া মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাঈদ চৌধুরী জানান, ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্রাক্টর জব্দসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এখন ট্রাক্টর দিয়ে পাথর তোলা বন্ধ রয়েছে। ট্রাক্টর দিয়ে যাতে পাথর তোলা না হয় সেজন্য পুলিশ সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে।

তেঁতুলিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলু বলেন, কিছুদিন ধরে ডাহুক নদীতে নতুন পদ্ধতিতে ট্রাক্টর দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। যা আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। যারা পাথর তোলেন আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ইউএনও ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা বলেছি। সেখানকার স্থানীয়রা আমার কাছে অভিযোগ করেছেন যে, এ পাথর উত্তোলনের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি জড়িত। আমার কথা হচ্ছে, যখন ড্রেজার মেশিন চলছিল, তখন তা আন্দোলন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এ ধরনের পাথর উত্তোলন যাতে আর না হয় সেদিকে আলাদা করে নজর দিতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করছি। একই সঙ্গে এই পাথর উত্তোলনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহাগ চন্দ্র সাহা বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। কালিতলা থেকে ডাহুক নদী পর্যন্ত এ ধরনের ট্রাক্টর দিয়ে কেউ যেন পাথর তুলতে না পারে সে জন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ডাহুক নদীতে ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করেছি। এছাড়া ডাহুক সেতু সংলগ্ন এলাকা থেকে বালু ও মাটি কেটে পাথর উত্তোলনের অপরাধে তিনজনকে তিন দিনের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।







