তথ্যপ্রযুক্তি

জলজ জীবনে পড়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

  জাগোকন্ঠ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ , ৪:১৮ অপরাহ্ণ

শানু মোস্তাফিজ:

ফরহাদ উদ্দীন (৪৩) হাওড়াঞ্চলের মানুষ। ছোটোবেলা থেকেই তিনি সারা বছর হাওড়ের মাছ দিয়ে ভাত খেতেন। ওইসব মাছ এত সুস্বাদু ছিল যে তা প্রতিদিন খেলেও তার কাছে অমৃত মনে হতো। সম্প্রতি দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য হাওড়ের জলজ জীবনে প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, ‘হাওড়ে সব সময় দেশি মাছ পাওয়া যায়।

হাওড়ের সতেজ পানির মাছের স্বাদই আলাদা। তবে ছোটোবেলায় যে ধরনের মাছ ধরতাম, এখন সে ধরনের অনেক মাছ নেই বললেই চলে। শুধু তাই নয়, কয়েক বছর ধরে হাওড়ে মাছের পরিমাণও অনেক কমে গেছে।’
হাওড়গুলোয় মাছ ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী ছিল। কয়েক বছর ধরে হাওড়গুলোয় অনেক ধরনের জলজ উদ্ভিদ, প্রাণী এবং দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাঙ্গুয়ার হাওড়কে মৎস্যসম্পদের আধার বলা হয়। বর্ষা মৌসুমে এখানকার মাছ জলপ্রবাহের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
বৃষ্টি মৎস্যসম্পদের জন্য বিশেষ আশীর্বাদ। বৃষ্টির ধারা জলজ জীবনকে যেন নতুন প্রাণ দান করে। মাছের প্রজননসহ এর সরবরাহ নদী থেকে সমুদ্রে বা সমুদ্র থেকে নদীতে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টি ঠিকমতো হচ্ছে না বলে তা মৎস্যসম্পদের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য নদীগুলো প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। নদীগুলোয় মাছ ছাড়া অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে। হাওড়াঞ্চালের জলজ জীবন একরকম। নদনদীতে জলজ জীবন আরেক রকম। সুন্দরবনে জলজ জীবন ভিন্ন রকম। কয়েক বছর ধরে যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে তাতে এসব জায়গার জলজ জীবন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে আমাদের দেশে জলজ জীবনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী মাছ। মৎস্যসম্পদ আহরণ করে জেলে সম্প্রদায় জীবিকা নির্বাহ করে। মৎস্যসম্পদের রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক দিক। এখন জলবায়ু পরিবর্তনে এই মৎস্যসম্পদ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চলনবিলের মাছ ব্যবসায়ী মো. রাজ্জাক বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ-পাবনা ও নাটোরের চলনবিল দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সেখানেও দেখা দিয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা। দিনদিন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য বিলের পানি কমে গিয়েছে। বেশি রোদের ফলে বিলের পানি গরম হলে সেখানকার মাছের পোনা নষ্ট হয়ে যায়। এতে মাছের বংশবিস্তার অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। কয়েক বছর আগেও চলনবিলে শত শত কোটি টাকার মাছ পাওয়া যেত। সেখানে এখন আগের মতো মাছ নেই। এজন্য ওই অঞ্চলের জেলেরা আর আগের মতো মাছ পান না। মাছ না পেয়ে তারা বেকার হয়েছেন। তাদের অনেকে পেশা পরিবর্তন করছেন। শুধু তাই নয়, মাছের অভাবে ওই এলাকার বরফের ব্যবসায় ধস নেমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে জলজ জীবনের প্রভাব কীভাবে মানুষের আর্থসামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করছে, এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ চলনবিল।’
সুন্দরবনে কর্মরত শেখ সোলায়মান বলেন, ‘সুন্দরবনে গাছপালা ছাড়াও কিছু খাল ও খাড়ি রয়েছে। আগে সেসব খাল ও খাড়িতে কুমির ছিল। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছিল। আইলা ও সিডরের সময় সুন্দরবনের শতকরা ৪০ ভাগ পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। ওই সময় সুন্দরবনের খাল ও খাড়িগুলোয় ব্যাপকভাবে লোনাপানি ছড়িয়ে যায়। তখন থেকে সুন্দরবনে লোনাপানির পরিমাণ বাড়ছে। ফলে সেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের থাকার জায়গা ও খাবার হুমকির মুখে পড়েছে। সুন্দরবনের অনেক গাছ লোনাপানি সহ্য করতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। পানির অভাবে ওখানে মিঠাপানির কুমির বিলুপ্ত হয়েছে। অনেক প্রাণীও লোনাপানির জন্য দিনদিন কমে যাচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছও কমে গেছে। সেখানে কম পানি থাকা এবং মিঠা পানি কমে যাওয়ার কারণে অপূর্ব সুন্দর ভোল মাছ, কই ভোল, গুলসা, সুস্বাদু পায়রাতলী, ট্যাংরাজাতীয় মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এভাবে সুন্দরবনে বেশকিছু জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়েছে।’
দীর্ঘদিন ইলিশ নিয়ে কাজ করেছেন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অভিজিৎ বসু। তিনি বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), নদীকেন্দ্র আন্ধারমানিকে কর্মরত আছেন। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব দেশীয় প্রজাতির মাছের ওপর পড়ছে। সমুদ্রের জোয়ারের সময় লোনা পানি বৃদ্ধি পেয়ে যখন তা নদী, জলাশয় কিংবা পুকুরে ঢুকে পড়ে, তখন সেখানকার দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য সেটা যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হিসাবে দেখা দেয়। লবণাক্ত পানির জন্য দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ক্ষমতাও কমে যায়। ওই পানিতে মাছ প্রজনন করতে পারে না। মাছের ডিমগুলো নিষিক্ত না হয়ে ওগুলো তাদের মলের সঙ্গে বেড়িয়ে যায়। এজন্য দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন দিনদিন কমে যাচ্ছে।’
অভিজিৎ বসু আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, ইলিশও জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে। আগে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সময় নদীগুলোয় প্রচুর পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যেত। এ বছর তা পাওয়া যায়নি। এ বছর জুলাই-আগস্টে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় ইলিশ নদীগুলোয় আসতে পারেনি। ওই সময় ইলিশ গভীর সমুদ্রে ছিল।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঠান্ডা জলের মাছ স্যামন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। সাগরের গরম পানির উষ্ণতা বাড়ালে সেই পানি যখন ঠান্ডা জলের নদীতে পড়ে, তখন তা স্যামন মাছের বেঁচে থাকার সংকট তৈরি করে। আমেরিকার খাড়ি অঞ্চলের পাখি পাফিনস মাছ খেয়ে বাঁচে। সমুদ্রের পানি উষ্ণ হলে ওই মাছগুলো অন্য জায়গায় চলে যায়। ফলে পাফিনস মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মৎস্যসম্পদের জন্য হুমকি নয়, জলের মধ্যে থাকা অন্য প্রাণীগুলোর জন্য তা সমান ক্ষতিকর। যেমন: কাঁকড়া, কচ্ছপ, নানা ধরনের সরীসৃপ, শুশুক, ঘরিয়াল, ডলফিনসহ আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য সংকট তৈরি করছে, যা জলজ পরিবেশে খারাপভাবে প্রভাব ফেলছে। এতে জলজ পরিবেশ ভারসাম্য হারাচ্ছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। তাহলে হয়তো কোনো উপায় বের হতে পারে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষসহ পশুপাখির খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। আগে নদী-খাল-বিলের মাছ ধরে সাধারণ মানুষ বা জেলে সম্প্রদায় সহজে তাদের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে পারত। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাঁরা সেভাবে মাছ পাচ্ছেন না। ফলে তাদের পুষ্টি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এতে তারা নানা ধরনের রোগব্যাধির সম্মুখীন হবেন বলে চিকিৎসকরা বলছেন। তারা আরও বলছেন, আগামী দিনে এ সংকট আরও বাড়বে। একইভাবে বিভিন্ন পশুপাখি মাছসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য ওইসব জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী ধ্বংস হওয়ায় ওই পশুপাখিগুলো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বড়ো প্রভাব পড়েছে মৎস্যসম্পদের ওপর। এটা আমাদের দেশের বহু মানুষের জীবিকার উৎস। আগে চলনবিল, হাওড়াঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চলে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, এখন তা কমে গেছে ব্যাপকভাবে। ফলে এটা অর্থনীতিতেও খারাপ প্রভাব ফেলছে। এজন্য এসডিজিতে জলজ জীবনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই জলজ জীবনকে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে আমাদের ব্যাপক গবেষণা দরকার এবং এগুলোকে আমাদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে। পিআইবি ফিচার

লেখক: সাংবাদিক

আরও খবর: