
সরকারকে ভুল পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার সুস্পষ্টভাবে ভুল পথে চলছে। আধিপত্যবাদবিরোধী বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু মাতারবাড়ী নিয়ে কী করা হয়েছে, তা জাতির সামনে পরিষ্কার করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা জনগণকে জানাতে হবে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে জাতীয় বিপ্লবী ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করা যাবে না, যার মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশকে কারও কাছে তুলে দেওয়া যাবে না। দেশের জনগণ ও যুবসমাজ আর আধিপত্যবাদ বরদাস্ত করবে না।
তিনি বলেন, আধিপত্যবাদের কালো ছায়ামুক্ত একটি স্বাধীন জাতি গড়ে তোলার জন্য তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূলের জন্য তাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, ‘মানবতার মুক্তি যতদিন পর্যন্ত অর্জিত না হবে, প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন জাতি যতদিন পর্যন্ত গড়ে না উঠবে, আমাদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক লড়াই ততদিন অব্যাহত থাকবে।’
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে সবাই জনগণকে কথা দিয়েছিল, গণভোটে বিজয়ী হলে সেই রায় মেনে নেওয়া হবে। কিন্তু এখন সেই প্রতিশ্রুতি মানা হচ্ছে না কেন?
তিনি বলেন, আবারও দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার আয়োজন চলছে। সরকার অধ্যাদেশ জারি করেছে এবং সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিষয়টি সামনে এসেছে। কিন্তু আলোচনার সব বিষয় গ্রহণ করা হয়নি। ২০টি বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ বন্ধ হতে পারত বলে তিনি মনে করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জায়গায় দলীয় লোকজন ও নেতাদের বসানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একজন দক্ষ, স্বচ্ছ ও সৎ ব্যক্তিকে দুদকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন যাকে বসানো হয়েছে, তার অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জাতি ইতোমধ্যে জানতে পেরেছে। এ ধরনের ব্যক্তিকে দিয়ে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, মেধার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছিল। তাদের দাবির প্রতি স্বীকৃতি দিয়ে মেধার ভিত্তিতে চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা ছিল। কিন্তু এখন পিএসসির চেয়ারম্যানকে চা খাইয়ে বিদায় দেওয়া হয়েছে। আরও দুজন সদস্যকে একইভাবে বিদায় করা হয়েছে। অন্যদেরও ডাকা হচ্ছে বলে শুনছি।
তিনি বলেন, এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা যে দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছিল, সেই দাবিকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের মেধার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পথ বন্ধ করে দেওয়া। শিক্ষার্থীরা যেন আর সেই আওয়াজ তুলতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, ১৭ বছর তাদের কর্মীরা নির্যাতিত ও বঞ্চিত ছিলেন। এখন তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে দলীয় নাম ও সংগঠনের নাম ব্যবহার করে বলেছেন, কর্মীরা যেন শুধু পরীক্ষার টেবিলে বসেন, বাকিটা তারা দেখবেন। এটি জাতির প্রতি এবং যুবসমাজের প্রতি উপহাস।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। মনে রাখতে হবে, বিপ্লব বারবার ফিরে আসে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাস তা প্রমাণ করেছে। জাতির প্রয়োজনেই বিপ্লব ফিরে আসে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা চেয়েছিলাম সংসদ অর্থবহ, কার্যকর ও প্রাণবন্ত হোক। প্রথম দিন থেকেই সবকিছুর বিরোধিতা করে সংসদ অচল করে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। সংগত বিষয়ে সহযোগিতা ও সমর্থন দেওয়া হবে। অন্যায় হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা হবে। এই নীতিতেই চলছিলাম। কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তারা সংসদকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে চান না।
তিনি আরও বলেন, ন্যায়-অন্যায় সবকিছু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে রাতারাতি পাস করা হচ্ছে। এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে।
র্যাবের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, শুধু বাংলাদেশের জনগণ নয়, সারা বিশ্ব থেকে এই বাহিনী বিলুপ্ত করার বিষয়ে আপত্তি ও সমালোচনা ছিল। ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ও সংস্কার প্রস্তাবে ক্ষমতায় গেলে র্যাব বিলুপ্ত করার কথা বলেছিল। কিন্তু তারা র্যাব বিলুপ্ত না করে সংসদে বিল এনেছে এবং পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্সিবিলিটি বাহিনী বা এসআরবি গঠনের ব্যবস্থা করেছে।
তিনি বলেন, সবকিছু আগের মতো রেখে শুধু নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। পিয়ন থেকে কমান্ডার পর্যন্ত সবাইকে একই জায়গায় রাখা হয়েছে। পোশাকের রং পরিবর্তন হয়নি, লোগোও পরিবর্তন হয়নি। শুধু নাম পরিবর্তন করে এসআরবি করা হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই বাহিনীর বিরুদ্ধে যে-সব নির্যাতন ও অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিচার কীভাবে হবে, যদি আগের লোকজনকেই একই জায়গায় রাখা হয়? তারা প্রমাণ ও আলামত নষ্ট করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, জামায়াতের প্রস্তাব ছিল, র্যাব বিলুপ্ত করা হোক। ভবিষ্যতে এ ধরনের বাহিনীর প্রয়োজন হলে সময় নিয়ে আলোচনা করে নতুনভাবে গঠন করা হোক। এই বাহিনীতে বিভিন্ন বাহিনী থেকে আসা সদস্যদের নিজ নিজ জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক। কারণ তারা বিভিন্ন বাহিনী থেকে প্রেষণে এখানে এসেছেন। এরপর সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষ নিয়ে নতুন বাহিনী গঠন করা যেতে পারে। তিনি প্রশ্ন করেন, তাদের এই প্রস্তাব কি অযৌক্তিক ছিল?
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার সবকিছু পাস করে দিচ্ছে। জনগণ ভোট দিয়েছিল রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন ও সংবিধানের সংস্কারের জন্য। কিন্তু এখন সরকার সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, জনগণ তাদের সংবিধান সংশোধনের জন্য কোনো রায় দেয়নি। জনগণ সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছে। তাই সরকারকে সংস্কারের পথে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার বিভিন্নভাবে তাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য ডাকছে এবং নানা প্রস্তাব দিচ্ছে। কিন্তু জনগণের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে তাদের সেই প্রস্তাবে অংশ নেওয়ার প্রশ্ন আসে না।
তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, সরকার মাত্র শিশু অবস্থায় রয়েছে, তাদের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু জনগণ কোনো শিশুকে ভোট দেয়নি। জনগণ প্রাপ্তবয়স্ক রাজনৈতিক নেতাদের ভোট দিয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতাসীনরা নিজেরাই অতীতে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার কথা গর্ব করে বলেছেন। মাঝখানে কিছুদিন সুযোগ পাননি, এখন আবার সুযোগ পেয়েছেন। তাহলে এত অল্প সময়ের মধ্যে এত কিছু উলটপালট করে দেওয়ার প্রয়োজন কেন?
তিনি বলেন, বিরোধী দল হিসেবে তাদের দায়িত্ব জনগণের পক্ষে কথা বলা। তারা যদি অন্যায়-অনিয়মের প্রতিবাদ না করেন, তাহলে জনগণের প্রতি অর্পিত দায়িত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। এই দায়িত্ববোধ থেকেই তাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে।
জামায়াতের আমির বলেন, সাত দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছি। এসব দাবির কোনোটি দলীয় দাবি নয়, সবগুলোই জনগণের দাবি।
তিনি বলেন, মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে তারা সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। কেউ মানুক বা না মানুক, সংস্কার বাস্তবায়ন করতেই হবে। এই সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির কোনো পথ নেই।
তিনি বলেন, ২৪ আন্দোলনে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটির নেতাদের হত্যা করা হয়েছে, বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে, কার্যালয় তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে, নিবন্ধন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, প্রতীক বাতিল করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দল হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
তবে এত কিছু সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামী কখনো ২৪ আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা কখনো বলেননি, এই বিপ্লবের কারিগর তারা, তারাই এর মাস্টারমাইন্ড।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনকে জামায়াতে ইসলামী দেশের জনগণের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিয়ামত মনে করে। এ জন্য তারা আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করেন। একই সঙ্গে নিজেদের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এবং আহত ভাই-বোনদের খোঁজ নিতে। দেশে কিংবা বিদেশে যেখানে যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, সেই অনুযায়ী সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।