জাতীয়

‘মানুষের কষ্ট লাঘবে লোডশেডিংয়ের রুটিন তৈরি করতে হবে’

  জাগোকন্ঠ ৬ জুলাই ২০২২ , ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের এখন একটাই উপায়, কখন, কোন এলাকায় বিদ্যুতের লোডশেডিং হবে সেটার একটা রুটিন তৈরি করা। যাতে মানুষ প্রস্তুত থাকতে পারে। মানুষের কষ্টটা যেন আমরা লাঘব করতে পারি।

বুধবার (৬ জুলাই) চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) আইটি বিজনেস ইনকিউবেটরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি আশা করি দেশবাসী আমাদের সহযোগিতা করবেন। সবাইকে আহ্বান করছি, প্রত্যেককে নিজ নিজ সঞ্চয় বাড়াতে হবে। খরচের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হতে হবে। যতটুকু পারা যায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হতে হবে। বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে হবে।

তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্ব একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। আমরা সবার ঘরে বিদ্যুৎ দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু বর্তমানে আমাদের লোডশেডিং করতেই হবে; উৎপাদনও সীমিত রাখতে হবে। যাতে আমাদের এই ভর্তুকিটা না দিতে হয়।

সরকারপ্রধান বলেন, আমি আপনাদের জানাতে চাই বিদ্যুতে মোট ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। গ্যাসের চাহিদা পূরণের জন্য এবং ইন্ডাস্ট্রি চালু রাখা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখার জন্য যে এলএনজি আমদানি করছি, সেক্ষেত্রে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

তিনি বলেন, প্রতি কিউবেক মিটার এলএনজি কিনতে সরকারের ব্যয় ৫৯ দশমিক ৬০ টাকা। কিন্তু আমরা সেটা গ্রাহকদের কাছে আগে বিক্রি করেছি মাত্র ৯ দশমিক ৬৯ টাকায়। যেটা সম্প্রতি বাড়িয়ে ১১ টাকা করা হয়েছে। তারপরও বিশাল অংকের ভর্তুকি রয়ে গেছে সেখানে। এই যে বিশাল অংক আমরা ভর্তুকি দিচ্ছি, এটা আমরা কতদিন দিতে পারব? কারণ আমাদের মানুষকে খাদ্য দিতে হবে, চিকিৎসা দিতে হবে, গৃহহীনদের ঘর দিতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের তাদের প্রতি নজর দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকা কেবল ভর্তুকিই দিতে হবে। আমরা যদি ভর্তুকি না কমাই সরকারের টাকা আসবে কোথা থেকে?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশেও সব কিছুর দাম বেড়ে যাচ্ছে। যেগুলো আমাদের কিনে আনতে হয়। ভোজ্যতেলও আমাদের আনতে হচ্ছে। সেখানে সবাইকে আহ্বান করেছি প্রত্যেককে নিজ নিজ সঞ্চয় বাড়াতে হবে। খরচের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছি। সেই বিদ্যুৎ আমরা দেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। তবে আপনারা জানেন রাশিয়া-ইউক্রেন যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে সে যুদ্ধ, আর যুদ্ধ শুরুর পরে রাশিয়ার ওপর আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা দিল, ইউরোপ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর ফলাফলটা এই দাঁড়িয়েছে, এখন তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে, ডিজেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এলএনজির দাম বেড়ে যাচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, সব কিছুর দাম এমনভাবে বেড়ে গেছে যে, এখন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালিয়ে রাখা ব্যয়বহুল ও কষ্টকর ব্যাপার হয়ে গেছে। তাই আমাদের নিজস্ব যেটুকু গ্যাস আছে তা দিয়েই চালিয়ে রাখতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, সেই বিষয়টাও আপনাদের আমি জানাতে চাই। কারণ এখানে যে ফার্নেস অয়েল, যার মূল্য ছিল মাত্র ৭০৮ টাকা। সেটা ইউক্রেন যুদ্ধের পর হয়ে গেছে ১ হাজার ৮০ টাকা। অর্থাৎ ৩৩২ টাকা বা ৫২ শতাংশ বেড়েছে। এলএনজি যেটা মাত্র ১০ মার্কিন ডলারে কেনা যেত, যুদ্ধের ফলে এখন তা ৩৮ মার্কিন ডলার হয়েছে। অর্থাৎ দাম বেড়েছে ২৮০ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কয়লাও ১৮৭ মার্কিন ডলার ছিল, এখন তা ২৭৮ মার্কিন ডলার হয়েছে। প্রায় ৬১ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেল লিটার যেটা ৮০ মার্কিন ডলার ছিল, এখন ১৩০ ডলার হয়ে গেছে। শোনা যাচ্ছে দাম ৩০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ সারা বিশ্ব এখন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা ডিজেলের ওপর অনেক নির্ভরশীল। সেই ডিজেলের দাম আরও বাড়বে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই নিষেধাজ্ঞা যদি না হতো তাহলে কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থাকলেও তাদের থেকে তেল, সার, গম এগুলোর সরবরাহ ঠিক থাকত। যদিও জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে একটা চ্যাম্পিয়ন গ্রুপ হয়েছে। তাতে আমি সদস্য হিসেবে আছি।

শেখ হাসিনা বলেন, সেখানে আলোচনা হয়েছে- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য এবং সার যাতে আনতে দেয় সে বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে এবং সুইফট বন্ধ করার কারণে আমরা ডলার দিয়ে রাশিয়া বা ইউক্রেন থেকে জিনিস কিনতে পারছি না। কাজেই ফাইন্যান্সিয়াল মেকানিজম কী হবে, এর উত্তর কেউ দিতে পারেনি।

তিনি বলেন, ইউরোপেরও খুবই দুরবস্থা, যদিও তারা রুবল দিয়ে কিনে নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সে বিষয়ে খুবই সীমিত সুযোগ আছে। তবুও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষিতে আমাদের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, বিদ্যুতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তারপরও আমরা সাধারণ মানুষকে নগদ অর্থ দিচ্ছি। এখন আমরা উপকারভোগী কার্ড করে দিচ্ছি, রেশন কার্ডের মতো পারিবারিক কার্ড। যেখানে স্বল্পমূল্যে প্রায় এক কোটি মানুষের জন্য কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। যাতে তারা স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য কিনতে পারে, সেই ব্যবস্থাও আমরা করে দিচ্ছি। মানুষের কল্যাণে যা যা করার সেই ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার ছোট বোন রেহানার মেয়ে টিউলিপের নামের সঙ্গে কম্পিউটার কোম্পানির নামের মিল থাকায় এটা তার (বর্তমানে লেবার পার্টির নির্বাচিত এমপি এবং শ্যাডো মিনিস্টার টিউলিপের ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানি) কোম্পানি বিবেচনায় দেশের ১০ হাজার স্কুলে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রায় অর্ধেক দামে নেদারল্যান্ড থেকে কম্পিউটার আমদানির যে চুক্তি করেছিলাম তাও বিএনপি সরকার বাতিল করে দেয়। এজন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৩২ কোটি টাকা জরিমানাও গুণতে হয় সরকারকে।

সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বর্তমানে সারা দেশে ৯২টি হাই-টেক পার্ক/সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক/আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে ৯টি পার্ক স্থাপনের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ৬৪ জেলায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মোবাইল এবং ল্যাপটপ উৎপাদনে সহায়ক ১৫৬ টিরও বেশি যন্ত্রাংশের ওপর ১ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক হ্রাস করে দিচ্ছি। ফলে, বিশ্বের খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের ১৫টি কোম্পানির মোবাইল ফোন সেট আমাদের দেশেই তৈরি হচ্ছে এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

তিনি বলেন, আগামীতে গার্মেন্টস পণ্যের সঙ্গে আমাদের ডিজিটাল ডিভাইসও সমানতালে বাংলাদেশে উৎপাদন এবং রপ্তানি হবে। আর রপ্তানি খাতে আগামীতে এটাই হবে একটি উল্লেখযোগ্য পণ্য যেটা রপ্তানি করে আমরা অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবো। আর সে লক্ষ্য নিয়েই তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং সমগ্র বাংলাদেশেরই সেভাবে প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম কোনভাবেই যেন আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে পিছিয়ে না থাকে সেভাবেই আমরা তাদের প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যবস্থা করছি। যে সমস্ত অবকাঠামো আমরা তৈরি করছি তা হবে আগামী প্রজন্মের মেধা, বুদ্ধি, জ্ঞানের বিকাশ কেন্দ্র এবং তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে জাতির স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। জাতির পিতা সেই উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখে যেতে না পারলেও তার সেই স্বপ্ন পূরণই আমাদের দায়িত্ব।