ক্যাম্পাস

চাকরি জীবনে ঘুরে ফিরে ঢাকায় থাকছেন তারা।

  জাগোকন্ঠ ১৫ অক্টোবর ২০২২ , ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ

করেসপন্ডেন্ট, আমিনঃ

রাজধানীর মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শামিনা হক। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরে ২০০১ সালে বাঙলা কলেজে বদলি হয়ে আসেন। এক টানা আট বছর একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার পরে মাত্র দুই থেকে তিন মাসের জন্য টাঙ্গাইলের সরকারি সাদত কলেজে বদলি হয়ে যান। সেটিও আবার প্রমোশন জণিত কারণে। প্রমোশন পাওয়ার পর ২০০৯ সালে আবারও ফিরে আসেন বাঙলা কলেজে। এরপর থেকে এক টানা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই কলেজে চাকরি করে যাচ্ছেন এই শিক্ষিকা। বর্তমানে তিনি কলেজে স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠান রোবার স্কাউটের বাঙলা কলেজের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর ব্যস্ততার অজুহাতে ফোন কেটে দেন এ শিক্ষিকা।
এ দিকে সরকারি চাকরিরত আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনসহ অন্যান্য ক্যাডারের চাকরিতে একই প্রতিষ্ঠান ও স্থানে তিন বছরের বেশি চাকরি করার সুযোগ নেই। তাদের বদলি বাধ্যতা মূলক থাকলেও উপেক্ষীতি শিক্ষা ক্যাডারের ক্ষেত্রে। যদিও বদলি নীতিমালার ১০ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের ৮ নম্বরে বলা হয়েছে. কোনো কর্মকর্তা ৩ বছরের বেশি কর্মরত থাকতে পারবে না। তবে কোনো প্রকল্প চলমান থাকলে সেটি শেষ করা পর্যন্ত থাকতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষক ও কর্মকর্তারা নানা ছলচাতুরি ও অভিনব উপায়ে একই পদে যুগের পর চাকরি করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার বদলি হয়ে রাজধানী ছাড়লেও অদৃশ্যের ক্ষমতা বলে ফিরছেন স্বপদে। ফলে প্রশ্ন উঠছে শিক্ষা ক্যাডারে বদলি ও পদায়নের সমতা নিয়ে। রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিদপ্তরের এক যুগেরও বিশ সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছেন এমন দেড় ডজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার তালিকা এসেছে জাগো কণ্ঠের হাতে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও অধিদপ্তরে চেয়ার ধরে রাখতে অভিবন কায়দা বেছে নেন এই সকল কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা।
তারা চেয়ার ধরে রাখার জন্য পদোন্নতি নেন না ঢাকার বাইরে বদলি হয়ে যাওয়ার ভয়ে। পদোন্নতির জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ডিপার্টামেন্টাল পরীক্ষাও দেন না। তথ্য ফাঁসের ভয়ে নিজেদের পরিচিত গন্ডির বাইরে তেমন কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। এমন কি সরকারি নির্দেশনা থাকার পরে ও পার্সোনাল ডাটা শিট (পিডিএস) আপডেট করেন না। বলা আছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান পিডিএস আপডেট এপ্রুভ না করলে নিজ দায়িত্বে করে নিতে হবে। কিন্তু সেটি তারা করেন না।

আর দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে অবস্থানের ফলে এই সকল শিক্ষক ও কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে কলেজের পরীক্ষার আন্তঃ কমিটি, সরকারি চাকরির পরীক্ষা কমিটি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে বাধ্য করা ও পরীক্ষার খাতায় নাম্বরও নিয়ন্ত্রণ করেন। এমন কি প্রতিষ্ঠানের অন্য শিক্ষকরাও তটস্থ থাকেন এ সকল সিন্ডিকেটের ভয়।

তেমনই একজন ঢাকার একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক ও বিভাগী প্রধান আব্দুর রশীদ (ছদ্মনাম)। বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগ দান করেও স্বাধীন মতো কাজ করার সাহস পাচ্ছেন না। জুনিয়র শিক্ষকদের সিন্ডিকেটের বাধায় থাকতে হচ্ছে হুমকির মুখে। এমন অভিজ্ঞতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিভাগীয় সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। পরীক্ষা প্রশ্ন প্রণায়ন ও নিয়ন্ত্রণ কমিটিতে তারা থাকতে চান। মূলত টাকা আয় করার জন্য তারা সব নিয়ন্ত্রণ করেন। এমন কি ক্লাস রুটিন করতে হয় তাদের ইচ্ছে মতো। না হলে নানা সমস্যা তৈরি করেন তারা।
এ দিকে বদলির নীতিমালার অনুচ্ছেদে চার এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে- অবসরে যাওয়ার আগের এক বছর সুবিধাজনক স্থানে বদলির জন্য আবেদন করলে পদ খালি থাকলে সরকার সেটি গ্রহণ করবে। কিন্তু চাকরি শেষ জীবনে এসেও অসুস্থ মা ও এক মাত্র মেয়ের পাশে থাকতে পারছেন না রাজবাড়ি সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সিরাজুল ইসলাম।
চাকরি জীবনে মাদারিপুর, বরিশাল,মাগুরা গোপালগঞ্জসহ অন্তত পাঁচ জেলায় চাকরি করেছেন। কখনো ঢাকায় আসার সুযোগ পান নি। বর্তমানে পারিবারিক কারণে জরুরি ঢাকায় বদলির জন্য বারবার আবেদন করেও ব্যর্থ হচ্ছেন এই শিক্ষক। তিনি বলেন, আমি চাকরি জীবনে পাঁচ জেলায় ঘুরেফিরে চাকরি করেছি। আমি নিজেও লিভার সিরোসিসের রোগী। ডাক্তার দেখাতে বারবার ঢাকা যেতে হয়। অনেকবার আবেদন করেছি। কিন্তু কাজ হয় নি। এখন তো আতঙ্কেও আবেদন করি না কারণ আবার কোথায় বদলি করে দেয় সেই ভয়ে।
শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ঢাকার সরকারি কলেজ ও বিভিন্ন দফতরের বদলির দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। এরমধ্যে রয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ( মাউশি), ডিআইএ, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, এনটিআরসিএ, এনসিটিবি, নায়েম, ব্যানবেইস, বাংলাদেশ প্রত্যয়ন পরিষদ (বিএসসি),প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ (ইইডি), কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। এছাড়াও ঢাকার বাইরের সরকারি কলেজের প্রভাষক ও অধ্যাপকদের বদলির দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের হাতে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের বিষয় তথ্য সংগ্রহ ও সরবাহ করার দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের। যে প্রতিষ্ঠানের কাজ তিন বছর পর শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বদলি করা। সেই প্রতিষ্ঠানেই একই পদে যুগের পর যুগ চাকরি করে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা। এমন কয়েকজনের নামের তালিকা এসেছে জাগো কন্ঠের হাতে। তাদের মধ্যে একজন দিল আফরোজ বিনতে আসিফ। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সহকারী পরিচালক তিনি। ২০০৬ সাল থেকে ঢাকায় কর্মরত আছেন। তার চাকরি জীবনে এক দিনের জন্যও রাজধানী বাইরে যেতে হয়নি।

এই বিভাগটির প্রধান কাজ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থায় পরিদর্শন এবং নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তুলে
ঢাকা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ জাকির হোসেন ২০০৭ সাল থেকে ঢাকা কলেজে চাকরি করেছেন। এরপর মাঝের কিছু সময় ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে কিছু দিন কাজ করেছেন। আবার ২০১৯ সালে ফিরেছেন ঢাকা কলেজে। সরকারি বাঙলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান লিখন। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলা কলেজে ছিলেন। বর্তমানে এনসিটিবিতে আছেন। কবি নজরুল সরকারি কলেজের ভুগোল বিভাগের অধ্যাপক এ বি এস এ সাদি মোহাম্মদ। ১৯৯৩ সাল থেকে কবি নজরুলে আছেন। মাঝে কিছু সময় তৎকালিন জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। এরপর থেকে একই কলেজে আছেন। সব মিলিয়ে একই কলেজে প্রায় ২৫ বছর শিক্ষকতা করছেন তিনি। সরকারি বাংলা কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম পলাশ। ২০০৪ চার সাল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (ডিজি) কার্যালয়ে, পরিদর্শণ ও নিরিক্ষা অধিদপ্তর ( ডিআইএ), ইডেন মহিলা কলেজে, ঢাকা কলেজে, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঘুরে আবারও সরকারি বাংলা কলেজে গেছেন। ইডেন মহিলা কলেজ সমাজ কল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোস্তারি সালেহিন। ২০০৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত একই কলেজে আছেন। বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এনামুল হক ২০০৮ সাল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজি) কার্যালয়ে, পরিদর্শণ ও নিরিক্ষা অধিদপ্তর ( ডিআইএ) অফিসে কাজ করছেন। এই পদে থেকে তিনি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন জানা যায়। ঢাকা কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত একই কলেজে চাকরি করেছেন। আর ২০১৫ সাল থেকে পরিদর্শণ ও নিরিক্ষা অধিদপ্তর ( ডিআইএ) আছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। ২০০৫ সালের ২ জুলাই থেকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বাংলাদেশ এক্সামিনেশন ডেভেলপমেন্ট ইউনিট (বিডু) নামের এক প্রকল্পেই চাকরি করে যাচ্ছেন, ভাসানটেক সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জেসমিন আক্তার। ২০০৫ সালের ২ জুলাই থেকে একই কলেজে আছেন। অভিযোগ রয়েছে তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুৎফুর জামান বাবারের নিকট আত্মীয়।মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সহকারী পরিচালক সাবিনা বেগম। ২০০৬ সালে একই পদে চাকরি করে চলেছেন। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এর উপ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণক মোহাম্মদ হোসেন। বাংলা বিভাগের এ অধ্যাপক ২০০১ সাল থেকে একই চেয়ারে আছেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক গাড়ি চালক কালুর ছেলে। অভিযোগ রয়েছে এই চেয়ারে বসেই গাড়ি চালকের ছেলে এই অধ্যাপক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। সরকারি বাঙলা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী আসমা সিদ্দীকা। ২০০৯ সাল থেকে একটানা একই কলেজে চাকরি করে চলেছেন।বাংলা কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহাবুবুল ইসলাম। ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকা কলেজে। এরপর থেকে আছেন বাঙলা কলেজে। সরকারি তিতুমীর কলেজের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনিরুজ্জামান। ২০১০ সাল থেকে এক টানা কাজ করছেন একই কলেজে।
এছাড়াও অনুসন্ধানে জানা গেছে, পদের বিপরিতে দুই থেকে তিনগুন শিক্ষককে ওএসডি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এমন দুটি কলেজের নাম জাগো কন্ঠের হাতে এসেছে। তার একটি কলেজে ২৩ পদের বিপরিতে শিক্ষক আছেন ৫৯ জন আরেকি কলেজে ২৩ পদের বিপরিতে ৬৬ শিক্ষককে পদায়ন করা হয়েছে। ঢাকার ১৯টি সরকারি কলেজে মোট পদ রয়েছে ৯২৪ জন শিক্ষকের। তার বিপরিতে ওএসডি সংযুক্তি ও ইনসিটো হয়ে অবস্থান করছেন আরও ৭১১ শিক্ষক। এই সকল শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের কোচিং করতে বাধ্য করা মতো গুরুত্বর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার করা। সুযোগ মতো যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে সেই দলে ভিড়ে গিয়ে নিজেদের সুবিদা ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে এই সকল শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।

আরও খবর: