সময় কেমন বদলে যায়, তাই না? একসময় যে মুখটা প্রতিদিন দেখা যেত, যার প্রশ্নের ঝড় সামলাতে হতো, যার হাসির আড়ালে লুকানো বুদ্ধিদীপ্ত কথাগুলো শুনতে হতো, আজ তার খোঁজও রাখা হয় না। ব্যস্ততা, সময়ের প্রবাহ, জীবনযুদ্ধ—সব মিলিয়ে প্রিয় মানুষগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
ঠিক তেমনটাই হয়েছে আমার এক শিক্ষার্থীর সাথে—যার সাথে সাত বছর ধরে কোনো কথা হয়নি। অথচ, সে ছিল আমার অন্যতম প্রিয় ছাত্রদের একজন।
আজ সকালটা ছিল অন্যসব দিনের মতোই। ক্লিনিকের ব্যস্ততা, রোগীর লম্বা লাইন, দৌড়ঝাঁপের মধ্যেই হঠাৎ চোখ আটকে গেল পত্রিকার এক অংশে। সেখানে একটা চেনা নাম উঁকি দিচ্ছে—তৌফিক সুলতান! আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল চমক! তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম—৪ ফেব্রুয়ারি ছিল তার জন্মদিন। কিন্তু আমি জানতেই পারিনি। উইশ করাই তো দূরের কথা, আমি তো এতদিন ধরে তার খোঁজও রাখিনি!
তৌফিক, তুমি কি আমাকে ভুলে গেছ?
একজন শিক্ষক বা লেখক তার ছাত্রদের মনে রাখেন, কিন্তু ছাত্ররা কি শিক্ষককে মনে রাখে? হয়তো ব্যতিক্রম কিছু ছাত্র-ছাত্রী থাকে, যারা মনে রাখে, কখনো হয়তো লিখেও ফেলে কোথাও।
তবে আমি নিশ্চিত, তৌফিক আমাকে মনে রেখেছে। কারণ, সে নিজেও একজন লেখক, গবেষক এবং শিক্ষক। যার লেখনীতে সমাজ, শিক্ষা ও নৈতিকতা উঠে আসে।
কিন্তু আমি? আমি কি তাকে মনে রেখেছিলাম? সত্যি বলতে, এই সাত বছরে আমি একবারও খোঁজ নিইনি। জীবন এতটাই ব্যস্ত করে ফেলেছে যে, কোথায় কোন প্রিয় ছাত্র কেমন আছে—সেই ভাবনাই মনে আসেনি। অথচ আজ এই পত্রিকার পাতায় হঠাৎ তার নাম দেখে বুঝলাম—আমি কতটা অন্যমনস্ক ছিলাম!
একজন শিক্ষক, একজন বন্ধু, একজন রহস্য
তৌফিক, তুমি ছিলে ক্লাসের সবচেয়ে কৌতূহলী ছাত্রদের একজন।

তোমার প্রশ্নের কাছে অনেক সময় আমাকেও থমকে যেতে হতো।
তুমি ছিলে সেই ছাত্র, যে জ্ঞানের জন্য পাগল ছিল, যে প্রতিটা বিষয় গভীরভাবে জানতে চাইতো, যে কেবল মুখস্থ করে নয়, বরং বিশ্লেষণ করে উত্তর দিতে চাইতো।
তোমার মধ্যে একধরনের রহস্য ছিল। তোমার মুখে ছিল সেই চিরচেনা মুচকি হাসি, যা কখনো আত্মবিশ্বাসের, কখনো ঠাট্টার, আবার কখনো গভীর ভাবনার ইঙ্গিত দিতো। তুমি এমনভাবে প্রশ্ন করতে যে, উত্তর দিতে গিয়েও ভাবতে হতো—তোমার আসল উদ্দেশ্য কী!
একটা দেরিতে পৌঁছানো শুভেচ্ছা
তৌফিক, আমি জানি তুমি পত্রিকা পড়ো।
তুমি কি জানো, আজ আমি কাকতালীয়ভাবে তোমার নাম দেখে থমকে গিয়েছি?
তোমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা দিতে পারিনি, এটা আমার ব্যর্থতা।
তোমার মতো প্রতিভাবান একজন মানুষ নিশ্চয়ই জেনে গেছে, জীবনে সময় কখনো কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
আমরা সবাই সময়ের দাস, আর ব্যস্ততা আমাদের বাস্তবতার বেড়াজাল। কিন্তু কিছু সম্পর্ক এমন, যা দূরত্ব পেরিয়ে গেলেও মুছে যায় না।
তোমার জন্মদিনের জন্য দেরি করে ফেলেছি, কিন্তু শুভেচ্ছা জানাতে দেরি করবো না—
শুভ জন্মদিন, প্রিয় ছাত্র!
তোমার লেখা একদিন হয়তো আরও বড় পরিসরে আলো ছড়াবে, হয়তো তোমার চিন্তা-চেতনা সমাজকে বদলে দেবে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি শুধু চাই, তুমি ভালো থাকো, এগিয়ে যাও, আর কখনো লেখা থামিয়ে দিও না!
হয়তো কোনো একদিন, কোনো এক সকালে, এক কাপ চায়ের সাথে তুমি এই লেখাটা পড়বে, আর তোমার সেই রহস্যময় হাসিটা দিয়ে ভাববে—
“এত বছর পর! স্যার/ম্যাডাম এখনো আমাকে মনে রেখেছে!”
আমি মনে রেখেছি, তৌফিক। দেরি করে হলেও মনে রেখেছি।
তোমার জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইলো।
তোমার শিক্ষক,
ডাঃ শারমিন সুলতান চৌধুরী (আরিন)
ডাঃ শারমিন সুলতান চৌধুরী, চিকিৎসক – ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল,ঢাকা।